খুন হয়ে যাচ্ছে সব সাদেক
বইটি প্রকাশ করে অন্যপ্রকাশ
Sadia Sultana
সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে লেখা এই বইয়ের বিভিন্ন গল্পে ধর্মীয় গোঁড়ামি, অতিপ্রাকৃত ঘটনা, লোকবিশ্বাস, জনশ্রুতি আর বিভিন্ন মিথ জায়গা করে নিয়ে গল্পগুলোকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এই বইয়ের প্রাককথনে গল্প নিয়ে লেখকের একটা সমৃদ্ধ আলোচনা আছে যা পাঠককে ঋদ্ধ করবে।
'খুন হয়ে যাচ্ছে সব সাদেক' বইয়ের প্রথম গল্প ‘স্মৃতির দরজা খুলে’ কেবল স্মৃতিকাতরতার গল্পই হয়ে থাকেনি-হয়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি গল্পের কোলাজ। গল্পকথক যুবকটির মায়ের হত্যাকারী তারই পিতা। সেই উচ্ছৃঙ্খল চরিত্রের পিতার ঔরষজাত সন্তান মিলার মৃত্যুর স্মৃতি, বৃদ্ধের বর্ণিত দাঙ্গা, দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি পড়ে পাঠকও নদীতীরে নৈঃশব্দ এঁটে বসে থাকা যুবক আর বৃদ্ধলোকটির মতো ভাববে, 'ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণে কেউ ফিরে গেলেও ইতিহাসে আজ যা লেখা আছে, তার একটুও নড়চড় হতো না।'
‘আলীমেয়েলির প্রস্থান ও ইতিহাসের বিস্মরণ পথে’ গল্পটি একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের গল্প, যে গল্পে আমাদের তথাকথিত চেতনাধারী মানুষের জটিল মানসিকতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামি প্রাধান্য পেয়েছে। এটি এই বইয়ের অন্যতম শক্তিশালী গল্প । ব্যাঙগাড়ির মাঠে গ্রামের একমাত্র তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ আলীমেয়েলির লাশ পড়ে ছিল। এরপর একে একে আলীমেয়েলির লাশ কীভাবে দাফন-কাফন করা হবে, জানাজা আদৌ পড়া হবে কিনা সেসব নিয়ে গল্পের ডালপালা ছড়িয়েছে।
‘অন্ধকারে বসে থাকেন বনসাই বাবা’ গল্পটির থিম খুব পরিচিত হলেও উপস্থাপনের ভিন্নতায় বনসাই হয়ে যাওয়া বাবা চরিত্রটি পাঠকের বোধে প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা দেয়। ‘চক্করকাটা জটির অদৃশ্য হওয়ার আগে’ গল্পে জটি চরিত্রটি পাঠকের কাছে রহস্যময় ও চমৎকার লাগবে। আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার ও জটির কোনো জায়গায় কিছুক্ষণ থেমে পুনরায় চলতে শুরু করার আগে একস্থানে দাঁড়িয়ে তিনটা চক্কর দেবার রহস্যময়তা পাঠককে ভাবায়।
বাড়ি ভর্তি মানুষ থেকেও কেন সবার একা থাকার অসুখ? ‘একা থাকার অসুখ থেকে’ গল্পটি পড়তে পড়তে পাঠক যখন নির্লিপ্তভাবে এগোতে এগোতে গল্পের শেষমুহূর্তে চলে আসে তখনই মূল গল্পের আভাস পাওয়া যায়। ‘গার্মেন্টস’ আর ‘গল্পটি পুরুষের কিন্তু কোনো পুরুষ বুঝবে না’ গল্প দুটো আমাদের দেশের খুব চেনা প্রেক্ষাপটে নারীর প্রতি যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণকে কেন্দ্র করে রচিত। 'গার্মেন্টস' গল্পটিতে আছিয়া, সফেলা, নাজমার প্রতি নির্যাতনের কথা পড়তে পড়তে পাঠক শিউরে উঠবে, এত ভয়াবহ কদর্যতা আর বিকৃতি লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের উঁচুতলার কথিত ভদ্রলোকদের যৌনাকাঙ্ক্ষার মাঝে!
‘কড়া নাড়ার শব্দে’ ও ‘লেখক যখন চরিত্র’ গল্প দুটি পরাবাস্তব গল্প। 'কড়া নাড়ার শব্দে' গল্পটিতে মানুষের মনোজগতের অন্ধকারের ভেতরে উঁকি দিয়ে পাঠক অদ্ভুত এক গ্লানিময়তায় আচ্ছন্ন হবে। একজন মা হিসেবে একটি দেবশিশুর ‘জন্মপূর্ব আত্মকাহিনি’ পড়তে পড়তে আমার বুকের ভেতর তিরতির করে কেঁপে উঠেছে। প্রসব পরবর্তী উৎকণ্ঠায় কাতর মায়ের করা 'কী হয়িচে চাচি?' প্রশ্নের সাথে সাথে যেন পুত্র সন্তানের জন্মের বাসনাকে ঘিরে আমাদের সমাজের ঠুনকো চিত্রটি প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
স্ত্রীর কাছ থেকে প্রতারিত একজন কবির ব্যর্থ জীবনের গল্প ‘আমরা চাইনি ও যথার্থ জীবনানন্দ হোক’, অনাকাঙ্ক্ষিত এক যুদ্ধশিশুর জন্মরাতের গল্প ‘আলোটুকু ফুটে রইল ফুল হয়ে’ এবং ভয় আর নির্ভয়ের দোলাচলে সমীর পাল নামের ‘একজন সংখ্যালঘুর বেঁচে থাকা’র গল্প গুলোও পাঠকের ভালো লাগবে।
‘খুন হয়ে যাচ্ছে সব সাদেক’ গল্পের মতো দেশে একে একে খুন হয়ে যাচ্ছে সব সাদেক। কাদের হাতে বা কেন সাদেকের মতো মানুষেরা খুন হচ্ছে তার কারণ কমবেশি জানা গেলেও শেষ অবধি বিচারপ্রক্রিয়া কতটা ফলপ্রসূভাবে মৃত সাদেকদের স্বজনদের স্বস্তি দিতে পারে তা জানা যায় না। শুধু খুনিদেরকে একে-অন্যকে বলতে শোনা যায়, 'এবার ভুল করি নি!’ আর ‘থুতনিতে কাটার দাগটা থাকলে আরও নিশ্চিত হওয়া যেত।'
‘মফস্বলে রাজধানীর কবি’ গল্পে এতদিনপর রাজধানী থেকে স্বনামধন্য কবি আসছেন কোনো এক মফস্বল শহরে। তাকে ঘিরে মফস্বলের কবিদের ভেতরে নানান উত্তেজনা, নানান আয়োজন আর কবিতা আসরের প্রস্তুতি চলে। হিউমার আর বিদ্রুপে ঠাসা এই গল্পটি পাঠে পাঠক বিমলানন্দ লাভ করবে।
‘চাকু’ ও ‘মুখোমুখি’ অণুগল্প দুটি এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার পর মনে হয়, আরও কিছু পড়ার ছিল, লেখকের বলারও ছিল অনেক। ‘চাকু’ গল্পের ভাইবোনের ছোট্ট কথোপকথনটি মনের গভীরে দাগ কাটে। যৌন হয়রানি বিষয়ক একটিমাত্র দৃশ্যপটের এই গল্পটি পাঠককে ভাবাবে। ‘মুখোমুখি’ গল্পটির নামের ভেতরেই গল্প অথবা গল্পকথকের সাথে লোকটির কথোপকথনের ভেতরে অনেক গল্প লুকানো।
