নো ওম্যান’স ল্যান্ড
গল্পগুলোতে জাদুবাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভায়োলেন্স— মানুষের মুখোশের আড়ালের চেহারাটা এমন করে উঠে এসেছে যে পাঠক পড়তে পড়তে শিউরে উঠবেন, প্রশ্নবিদ্ধ করবেন নিজেকেও । গল্পের পাশাপাশি সাইকো থ্রিলার জার একটি উপন্যাসিকায় মোজাফ্ফর ভায়োলেন্স দিয়ে ভায়োলেন্স প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর তৈরি করেছেন । প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশনস।
গীদা দাস
মোজাফফর হোসেন এর ‘নো ওম্যান'স ল্যান্ড’ নামটিই পাঠক টানে। নো ম্যান'স ল্যান্ড শব্দটি সর্বজনবিদিত। সিনেমা, উপন্যাসের নাম আছে, রাজনৈতিক মঞ্চে এবং বিশেষ করে কূটনৈতিক জগতে অবিসংবাদিত ক্ষেত্র। নারী আন্দোলনে সম্পৃক্ত ব্যক্তি মাত্রইনো ওম্যান'স ল্যান্ড নামে আকৃষ্ট হবে।
তবে আমি আকৃষ্ট মোজাফফরের যে কোনো লেখায়। মোজাফফরের লেখার প্রতি এ আকৃষ্ট হওয়া তার ছাত্র জীবন থেকেই। সেটা তখন লেখার গুণগতমান বিচার না
করেই। তার কোন বই প্রকাশ আমাকে আনন্দিত করে। দেখতে দেখতে - পড়তে পড়তে অনুভব করি মোজাফফর সিঁড়ির অনেক উপরে। গুণগত ও পরিমাণগত দুদিক থেকেই।আপ্লুত হই।
বন্ধু সবিতা শর্মা Sabita Sarma বইমেলায় বই কিনবে। নাম জানতে চাওয়াতে কিছু বইয়ের কথা বলেছিলাম। নো ওম্যান'স ল্যান্ড এর মধ্যে একটি। আমি কেনার আগেই সে নিজে আগে না পড়ে বইটি আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল। বইটির বেশ কিছু গল্প আগেই পড়া।
প্রথম গল্পটি আনিসুল হকের নো ম্যান'স ল্যান্ড উপন্যাসের কথা মনে করিয়ে দিলেও মূল আলাদা। ঐটা এক বানরের আর এটা এক নারীর না মানুষী ভূমিতে পড়ে থাকারকাহিনি। এটায় নারীর উপর সহিংসতার এক অনবদ্য আলেখ্য।
আবর্তিত নারী চরিত্রটির অবস্থান এ উপমহাদেশের যে কোনো স্থানের। নির্যাতনের শিকারনারীর "পোশাকেও ধর্ম কিংবা জাতীয়তাবাদের পরিচয় বোঝা যাচ্ছে না। পৃথিবীর সকল দুঃস্থ ও গৃহহীন লোকের ধর্ম ও জাতীয়তা বোধহয় এক।গরিব লোক গরিব হতে হতে যে
জিনিসটা হারায় তার হলো নাগরিক মর্যাদা ও ধর্ম।"
তবে মরার পর ধর্মের প্রশ্ন আসে। " পোড়ানো হবে, না মটি দেওয়া --- " নারীকে নিয়ে এমন গল্প বাংলা কথা সাহিত্যে বিরল।
ডেথফরহেভেন্ডটকম গল্পে ইদানিংকালের অনলাইনে সার্ভিস সিস্টেমের মধ্যে লাশ দাহ নিয়ে বাণিজিক চিত্র সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
জাদু বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতা একটু একটু বুঝি। একেবারে না বুঝলে ভালো ছিল অথবা ভালো বুঝলে।কাজেই এ দোলায়িত জ্ঞানে ভ্রমে বিভ্রমে, আত্মহত্যা করার জন্য লোকটি মরেনি, জলের মাঝে স্বপ্নের বুদবুদ, ব্রেকিং নিউজের পরে গল্পগুলো আমাকে বিভ্রমে ফেলেছে।
পারাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা, একটি হাতের সন্ধান চেয়ে বিজ্ঞাপন, গেরিলা দাফন মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে মনে করিয়ে দেয়। শত শত বছর দেশপ্রেমের, মুক্তিযদ্ধের, ভাষা আন্দোলনের আবেগকে জিইয়ে রাখতে এমন গল্পই প্রয়োজন।
নারীর জীবন, নারীর উপর সহিংসতা,নারীর প্রতি বৈষম্য, নারীর প্রতি পরবর্তী প্রজন্মের আবেগ, পরিবার ও সমাজে নারীর অবস্থান ইত্যাদি লেখক আবেগের সাথে, সহমর্মিতার সাথে ভিজে যাওয়া শব্দগুলো, আমার মা বেশ্যা ছিলেন,পেছন ফিরে তাকিয়ে থাকা পথ, কত দেবে ওরা?মাকে আর মনে পড়ে না গল্পগুলোতে ফুটিয়ে তুলেছেন।
সমসাময়িক জীবন চিত্রায়িত ছেলেটি বোমা হামলায় বেঁচে গিয়েই মরল, বরকত নামে কেউ একজন ছিল এই শহরে গল্প গুলোতে।
বইয়ের নামকরণ করা হয়েছে সাইকো থ্রিলার নো ওম্যান'স ল্যান্ড বড় গল্পটির নামে। এটাকে যদিও ‘সাইকো থ্রিলার জনরার একটি উপন্যাসিকায় মোজাফফর ভায়োলেন্স দিয়ে ভায়োলেন্স প্রতিরোধের কন্ঠস্বর তৈরি করেছেন’ বলে প্রচ্ছদের পেছনের পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে।
মনপুরার কাহিনিটি নারীর উপর সহিংসতার এক বাস্তব চিত্র। গল্পটি খেটে লেখা। বেশ কিছু পরিসংখ্যান আছে। আছে পুলিশ বিভাগের অভ্যন্তরীণ কিছু নৈমিত্তিক চিত্র। গল্পটি এক নিশ্বাসে পড়া যায়। জানা যায় নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের নেতিবাচক উপায়—যা মোটেই কাম্য নয়। লেখক এখানে বিষয়টিকে কৌশলে ইতিবাচকভাবে জনজাগরণের পথ দেখাতে পারতেন। সমকামিতার বিষয়টি যথেষ্ট কৌশলে ইতিবাচকতায় শেষ হয়েছে- যা প্রগতিশীল মানুষমাত্রই একমত হবেন। তবে পশুপ্রেমও গল্পটিতে প্রতিফলিত --- যেজন্য রিশাদ অপরাধী।
দিনারের স্ত্রীর গর্ভবতী হবার ঘটনাটি পড়ে চমকানোর কিছু নেই। তা আমাদের সমাজে ঘটছে। এজন্য ঢাকায় অনেক ল্যাবে নাকি গোপনে ডি এন এ টেস্ট করানো হয় (শোনা কথা)। নো ওম্যান'স ল্যান্ড এ দিনারের কথা মাঝে মাঝে উত্তম পুরুষে বাক্য তৈরি। এটা কি আগে কোনো অন্য গল্প ছিল?
আন্তন চেখভ একটা কথা বলেছিলেন -'যদি কাহিনীতে একটা পিস্তলের কথা আসে, সেটা থেকে গুলি ছোঁড়া হবেই।‘কিন্তু মোজাফফর হোসেন এ গল্পটিতে কেন যে কপিল আর শাপলুর ঘটনা এনেছেন তা স্পষ্ট নয়।
যাহোক, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে নো ওম্যান'স ল্যান্ড বইটি এক মূল্যবান সংযোজন।
পরিশেষে দুঃখের কথা বলি। বইটি আমার বন্ধুর এবং আমি সব সময় খুব যত্নের সাথে বই পড়ি ও সংরক্ষণ করি। কিন্তু বইটির মলাট বাঁকা হয়ে গেছে। বন্ধুটিকে তা জানানোর পর বলল, বইটি বাণ্ডিং করে না শুকিয়েই বাজারে ছেড়েছে। সত্য কি না জানি না। এমনটি করা হয়ে থাকলে না করার অনুরোধ রইল। এতে পাঠক ঠকে। বইটি পড়া হয়ে গেলেও কিনে সংগ্রহে রাখার ইচ্ছে আছে।
