পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা
বইটি প্রকাশ করেছে অগ্রদূত। বইটির পাণ্ডুলিপি আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করে।
কথাসাহিত্যিক ওয়াসি আহমেদ
সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের এখানকার গল্পচর্চায় পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা একটা অত্যন্ত বলিষ্ঠ সংযোজন। লেখক গল্পকে অনেক ক্ষেত্রে গল্প থেকে বিচ্যুত করে আবার অগল্পকে তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবনকুশলতায় গল্প বানিয়ে নির্মিতিকে এক অসামান্যতায় মুক্তি দিয়েছেন। গল্পকার মোজাফ্ফর হোসেনের এখানেই সার্থকতা।
বইয়ের ভূমিকায় মোজাফ্ফর তাঁর গল্পের প্রেক্ষাপট ও নির্মিতি নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। পাঠক তা না পড়লেই পারেন; কারণ কী নিয়ে গল্প, কেন এভাবে লেখা এসব প্রশ্নের জবাব পাঠকের তালাশ করার কথা নিজের মতো করে। এ চ্যালেঞ্জটুকু পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ—বিশেষ করে যদি তাকে মোজাফ্ফরের অন্তত গোটা পাঁচেক গল্প নিয়ে ভাবতে হয়। বইয়ের নাম-গল্প ‘পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা’ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। বিষয়ের সঙ্গে অত্যন্ত লাগসই শিরোনামের এ গল্প আদতে কোনো গল্প নয়, এটি একটি প্রতিবেদন—গোটা দেশের জন্মনাড়ি চেপে ধরা এক অন্তর্ভেদী প্রতিবেদন যা স্বাধীন-অস্বাধীনের মর্ম ও তাৎপর্যকে কাটাছেঁড়াই করে না, তাতে প্রবল কুঠারাঘাতও হানে। কিন্তু কুঠারাঘাতই লেখকের একমাত্র লক্ষ্য নয়, বরং কেন তিনি তাঁর নির্মোহ বয়ানে স্বদেশকে পরাধীন বলছেন সেদিকে পাঠকের মনোযোগ কেড়ে নিয়ে পাঠকের ওপরই ব্যাখ্যার ভার ও চাপ ছেড়ে দেন। কী দাঁড়ায় শেষ পর্যন্ত? যারা বিকলাঙ্গ হয়ে, ছিন্নভিন্ন শরীরে মরে গিয়ে যে স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে, সেটাই কি প্রকৃত স্বাধীনতা? তারা কি কারো প্রতিপক্ষ, না তারাই মূল পক্ষ—বিচার পাঠকের। এটাই শক্তি গল্পকার মোজাফ্ফরের। বলার অপেক্ষা রখে না, এ সেই শক্তি যা নিজেকে প্রকাশ্য হতে দেয় না, কল্প-বাস্তবের আলো-আঁধারিতে পাঠককে টেনে নিয়ে পরিস্থিতি অনুধাবনের সুযোগ করে দেয়, তবে পরিস্থিতির জটিলতা থেকে বেরোবার পথ বাতলে দেয় না। পাঠককে মোজাফ্ফর এতটাই গুরুত্ব দেন।
কথাগুলো থেকে যদি এমন ধারণা হয় মোজাফ্ফর তথাকথিত অগল্পকে গল্প বানাতেই মনোযোগী, তাহলে কয়েকটা গল্পের কথা এসেই যায়, যেখানে তিনি একদিকে যেমন অসামান্য গল্প বলিয়ে, তেমনি গল্পের ভিতরে গল্প পুরে নতুন ধরনের আখ্যান তৈরিতেও পাকা কারিগর। মূল গল্প তিনি তাঁর মতো করে বানান, তবে ভেতরে শাখা-প্রশাখা ছড়ানো অন্য গল্পগুলোকে অব্যক্ত রেখে দেন পাঠকের জন্য—তারা নিজেরা বানাবে বলে। ‘বরকত নামে কেউ একজন ছিল এই শহরে’ তেমনি এক গল্প। শহরের কেন্দ্রে, যাকে বলা হয় জিরো পয়েন্ট, একটা মৃতদেহকে ঝুলতে দেখা যায়, একজন মাঝবয়সি পুরুষের মৃতদেহ—পুলিশের পরিভাষায় ডেড বডি। গল্পে পুলিশই ভাষ্যকার, একজন পুলিশ অফিসার এই অজ্ঞাতপরিচয় ডেড বডির পরিচয় খুঁজতে গিয়ে, এবং কারা তাকে খুন করে থাকতে পারে এ তদন্তে নেমে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তা মোটেও এ দেশে নতুন নয়, পুলিশের কাছে তো নয়-ই। অজ্ঞাতপরিচয় এই ডেড বডি দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক ও মিডিয়া-ন্যারেটিভকে উন্মোচন করে চলে, সেই সাথে পুলিশি-ন্যারেটিভকেও। ডেড বডির পরিচয় মেলে, জীবিতাবস্থায় তার নাম ছিল বরকত। কিন্তু দেখা গেল জীবিত থাকাকালীনও সে এক রকম নাম-পরিচয়হীনই ছিল। তাকে যারা চিনত তাদের অধিকাংশই তার নাম জানত না। তবে খোঁজাখুঁজিতে যখন জানা গেল সে তার বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে এক প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করত, তাতেও জট তেমন খুলল না। কারণ সে যেমন নিজেকে সামাজিকভাবে পরিচিত করতে, সমাজের একজন হতে, ইনসাইডার হতে সামান্যতম গরজ দেখায় নি, সমাজও তার ব্যাপারে ছিল নিরাসক্ত। সমাজে বাস করেও সে ছিল সর্বার্থে একজন আউটসাইডার। এ পর্যায়ে পুলিশের কাছে ‘কে সে’ এ প্রশ্নটা যখন বড় হয়ে দেখা দেয়, তখন শুরু হয় খানাতল্লাসি। তাতেও তেমন ফায়দা হয় না, তবে ‘পুলিশ কী না পারে’ এই প্রবাদের সত্যতার খাতিরে পুলিশের হাতে উঠে আসে একটা জীর্ণ ডায়েরি, তাতে এক জায়গায় পাওয়া যায় বরকতের নিজের হাতে লেখা দুটি ছোট ছোট বাক্য : ‘আমিও চাই সকলে জানুক আমাকে। জানুক বরকত বলে কেউ একজন ছিল এই শহরে।’ মৃত্যুর এক দিন আগে লেখা বরকতের জবানবন্দি তার মৃত্যুবিষয়কে রহস্যের অবসান ঘটায়, সেই সাথে এক আমরণ অজ্ঞাতনামার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার দুঃসহ আর্তিও পাঠককে তীব্রভাবে বিদ্ধ করে। আপাতদৃষ্টিতে গল্পের এখানেই শেষ, তবে গল্পের মার্জিনে অনেকগুলো গল্পের মুখ খুলেও লেখক সেগুলোকে রুদ্ধ করে রেখেছেন—পাঠককে ভাবনার খোরাক জোগাতে, যাতে পাঠক চাইলে সেই ছিপি আটকানো গল্পগুলো নিজেই বানাতে পারেন। যেমন— ডেড বডিকে বরকত বলে আবিস্কার করা ও তার মৃত্যুর কারণ জানার পর পুলিশ কি বিষয়টাকে সর্বসাধারণের কাছে বুক ফুলিয়ে তুলে ধরবে, না-কি ‘পুলিশ কী না পারে’ এই প্রবাদকে আরো তাৎপর্যময় করতে অন্য কোনো পথ বেছে নেবে—সে-গল্পে লেখক যেতে চান না, পাঠক চাইলে পারেন।
‘আমার মা বেশ্যা ছিলেন’ গল্পটি নানা করণে উল্লেখযোগ্য। এখানেও পূর্বোক্ত গল্পটির মতো মোজাফ্ফর অপ্রতিরোধ্য গল্প বলিয়ে, থুড়ি, যার বয়ানে গল্পটি বলা হয়েছে, সে। গল্পে লেখক মোজাফ্ফরকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। যে ঘটনাপুঞ্জ এ গল্পকে পরিণতির দিকে ধাবিত করেছে তা যেন অবধারিত। এ এলিয়টের সেই অবজেক্টিভ কোররিলেটিভ, যা ঘটনা ও ঘটনার ভগ্নাংশের সংশ্লেষে এক প্রবল অবিচ্ছিন্নতায় মূল চরিত্রের আশপাশকে এতই ঘনবদ্ধ ও অনিবার্যমুখী করে তোলে, ঘটনার সহগামী হওয়া ছাড়া তার করার কিছু থাকে না। তাই সে যখন গল্পের শেষে বলে, খুব পাপ করতে ইচ্ছা করে, তখন সে যে পারিপাশ্বিক ঘটনার নির্বিরোধ শিকার তা আড়াল থাকে না।
গল্প বলা ও গল্পকে রুদ্ধ করা—দুদিকেই মোজাফ্ফর পারদর্শী। গল্প বলায় যেমন ‘আত্মহত্যা করার জন্য লোকটি মরেনি’, ‘ভিজে যাওয়া শব্দগুলো’, ‘এক্সভিডিওজ ডটকম’ তাঁকে বিশিষ্টতা দেয়, তেমনি রুদ্ধবাক গল্প হিসেবে ‘পাপ-পুণ্যের মাঝে’, ‘ছেলেটি বোমা হামলায় বেঁচে গিয়েই মরল’ উল্লেখযোগ্য।
সার্ভিয়ান ঔপন্যাসিক ও ইতিহাসবেত্তা মিলোরয়েড প্যাভিচ, যিনি ‘ডিকশনারি অফ দ্য খাজার্স’ নামের অবিশ্বাস্য লেক্সিকান উপন্যাসেরও প্রণেতা, নিজের রচনার কল্পনারহিত অভিনবত্বের পাশাপাশি যে বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন তা হলো পাঠককে নতুন ধরনের পাঠাভ্যাসে দীক্ষিত করা। তুলনাটা বাড়াবাড়ি রকমের অসম হলেও একথা বলা-ই যায় মোজাফ্ফর হোসেনও পাঠককে ভিন্ন ধরনের পাঠ-অভিজ্ঞতা উপহার দিতে প্রস্তুত।
গৌতম চৌধুরী
"ভয়াবহতা আর সৌন্দর্য, জীবনের এই দুই মেরুকেই বারবার স্পর্শ ক’রে গেছে এই গ্রন্থের গল্পগুলি। তবু কেবলই জীবনের চলচ্ছবি মাত্র হয়ে উঠতে চায়নি তারা। তাই এই লেখাগুলি পড়তে পড়তে নিছক গল্পপাঠের আনন্দের অতিরিক্ত কিছু পেয়ে যাই আমরা। মনে হয়, একেই বুঝি সাহিত্য বলা হয়ে থাকে। পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা-র রচয়িতা তেমনই একজন সাহিত্যিক, যাঁর জন্য বাংলাভাষার পাঠক অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁকে আমাদের অভিনন্দন।"
– কবি গৌতম চৌধুরী, পশ্চিমবাংলা (জুরি বোর্ডের সদস্য, আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কার-২০১৮)
জাহিদ নেওয়াজ খান
তিনি যখন দলে দলে মৃত মানুষদের কথা বলেন, আপনি যখন সেটা পড়েন, আপনিও হয়ে যান মৃতদের একজন। আপনি বেঁচে আছেন, কিন্তু আপনি মৃত। আপনার জিভ আছে, কিন্তু আপনার জিভ অর্ধেক কাটা, আপনি কথা বলতে পারেন না। আপনার মগজ আছে, কিন্তু বেয়োনেটে আপনার মগজ অর্ধেক তুলে নেওয়া, মগজ হারানো আপনিও ভাবতে পারেন না। আপনার দুটি পা-ই আছে, কিন্তু আপনার একটি পা নেই, আপনি তাই হাঁটতে পারছেন না।
মোজাফ্ফর হোসেন তার গল্পের নির্মাণ দিয়ে আপনাকে এমন একটা জগতে নিয়ে যান যেখানে আপনি আপনার গুলিবিদ্ধ কান নিজেই ছিঁড়ে ফেলার যন্ত্রণা বোধ করেন, কিংবা গণপিটুনিতে নিহত ভাইয়ের ভুল লাশ নিয়ে আসার সময়ও মুখ ফুটে বলার সাহস না পাওয়ার যস্ত্রণা অনুভব করেন।
কুকুরের মতো গন্ধ শুঁকে শুঁকে মোজাফ্ফর আপনাকে এমন গল্প বলেন যেখানে আপনি অন্য মানুষের গন্ধটাও টের পান, হোক সেটা শরীর থেকে গলে পড়া পুঁজ কিংবা সুবাসিত সাবানে স্নানের পর যৌনকাতর কোন নারী।
মোজাফ্ফরের গল্প আপনাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেবে, আপনার ভেতরের সবকিছু ছিঁড়েখুঁড়ে দেবে, আপনাকে থমকে দেবে-চমকে দেবে। মোজাফ্ফরের গল্প আপনাকে শুধু গল্পের ভেতরেই নিয়ে যাবে না, নিজেকে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেবে যেখানে এক ঘোর লাগার বোধে তাড়িত হয়ে আপনি এক অশরীরী শরীর হয়ে গতিময় স্থবিরতায় কাতর হবেন। আপনি জীব হলে মোজাফ্ফরের গল্প আপনাকে জড়ত্ব দেবে, আপনি জড় বা ক্লীব হলে জীবত্ব।
মোজাফ্ফরের গল্প পড়লে আপনি এমন গল্প পড়বেন যে গল্পগুলো আপনি কখনোই পড়েননি, অথচ তার সব গল্পই জীবনের, যে গল্পগুলো তার ভাষায় ‘হতে পারতো গল্প’।
‘অতীত একটা ভিনদেশ’ থেকেই বুঝতে পারছিলাম ‘খুন হয়ে যাচ্ছে সব সাদেক’ এর মতো মোজাফ্ফর সবাইকে এবং সব কিছুকে খুন করতেই বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হয়েছেন। ‘পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা’র গল্পগুলো এমন যে আপনি যে স্বাধীন মানুষ, সেই মানুষটিকে মোজাফ্ফর তার গল্প দিয়ে পরাধীনতার এক জগতে নিয়ে যাবেন যেখানে নিয়ন্ত্রক মোজাফ্ফরের গল্প।
স্বকৃত নোমান:
সেদিন ‘সমকালীন লাতিন আমেরিকান গল্প’ বইটি পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, আমি আসলে একটা কুয়োর ব্যাঙ। কুয়োতেই থাকি, কুয়োতে ডিম পাড়ি আর নিজেকে কুয়োর রাজা বলে ঘোষণা করি। এই উপলব্ধির কারণ আছে। কারণ, আমি খুব বেশি জানি না আমেরিকার বা লাতিনের বা আফ্রিকার বা ইউরোপের বা এশিয়ার বা অস্ট্রেলিয়ার তরুণ গল্পকারটি কেমন গল্প লিখছে, তার আঙ্গিক কেমন, তার ভাষা কেমন। আমি এখনো বিশ শতকে রচিত সাহিত্যকর্মগুলো নিয়েই পড়ে আছি।
কদিন ধরেই শুনছিলাম মোজাফফর হোসেনের ‘পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা’ গল্পগ্রন্থটির কথা। কিনব কিনব বলে কেনা হচ্ছিল না। গতকাল বইমেলায় শ্রদ্ধেয় নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর সঙ্গে দেখা। তিনি মোজাফফরের গল্পের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন এবং অনেককে মোজাফফরের বইটি কেনার পরামর্শ দিলেন। তাঁর মুখে বইটির প্রশংসা শুনে আমার আগ্রহ বেড়ে গেল। বইটি সংগ্রহ করলাম। আজ বইটি পড়তে পড়তে মনে হলো, আমার আগের উপলব্ধিটা পুরোপুরি সঠিক নয়। বাংলাদেশে মোজাফফরের মতো তরুণ গল্পকারটি কেমন লিখছে, তার ভাষা কেমন, তার বিষয় কী, তার আঙ্গিক কেমন―তা কি জানে উল্লিখিত দেশ বা মহাদেশের তরুণ গল্পকাররা? খোঁজ-খবর নেয়? নেওয়ার চেষ্টা করে? উত্তর : না। সুতরাং তারাও কুয়ার ব্যাঙ। তারা তাদেরটা নিয়ে আছে, আমরা আমাদেরটা নিয়ে।
এক গল্পের সঙ্গে আরেক গল্পের তুলনা হয়ত চলে না। প্রত্যেক গল্পেরই স্বকীয় বৈশিষ্ট্য থাকে। তবু যদি ‘সমকালীন লাতিন আমেরিকান গল্প’ বইটিতে অন্তর্ভুক্ত লাতিনের তরুণ গল্পকারদের গল্পের সঙ্গে মোজাফফরের গল্পের তুলনা করি, তাহলে বলতে হয়, মোজাফফরের গল্পগুলোই পাঠক হিসেবে আমার কাছে বেশি ভালো লেগেছে। বইটিতে মোট উনিশটি গল্প। এগারটি পড়েছি। পাঠশেষে আমিও শ্রদ্ধেয় নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর মতো উচ্ছ্বসিত। নিঃসন্দেহে বলছি, আমাদের গল্প পিছিয়ে নেই। আমাদের হীনম্মন্যতার কোনো কারণ নেই।
বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ গল্পকারদের প্রয়াণে বা নিষ্ক্রিয়তায় আমাদের গল্পসাহিত্যে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই শূন্যতা ভরাট হতে চলেছে। মোজাফফরের মতো তরুণরাই শূন্যতাটা ভরাট করছে। তার গল্পগুলো পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল না আমি তেত্রিশ বছর বয়সী কোনো তরুণ গল্পকারের গল্প পড়ছি। মনে হচ্ছিল, যার গল্প পড়ছি তার বয়স সত্তর কিংবা তারও বেশি। মোজাফফর আপনাকে অভিনন্দন।
উল্লেখ্য, বইমেলার আর একদিন বাকি। মোজাফফর হোসেনের ‘পরধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা’ গল্পগ্রন্থটি সংগ্রহ করতে পারবেন ‘অগ্রদূত’ প্রকাশনীর স্টল থেকে।
টুকে রাখা কথামালা
০১.০৩.২০১৯
রিপন আহসান ঋতু:
পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা, একটি গল্পগ্রন্থ। অগ্রদূত প্রকাশনী প্রকাশ করেছেন এটি। গল্পকার মোজাফ্ফর হোসেন-এর প্রতিটি লেখায় থাকে মানবিক জীবনের না বলা কথামালর শিল্পসম্মত ইঙ্গিত। "এত টনটনে তোমার গল্পের বর্ণনা, এত বিশ্বস্ত বুনন- আমি সেই জাল থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারিনি। তুমি দিব্যি নতুন নতুন প্লটের গল্প লিখেছ, বদলেছ তোমার জীবন। আমাকে নিয়ে আর একটি লাইনও লিখলে না কোথাও, কৌশলে আমাকে বেঁধে ফেললে গন্তব্যহীন পথে।" পাঠক, আমার বিশ্বাস যারা গল্প পড়েন বা পড়তে ভালবাসেন তারাও খুব অবাক হবেন নতুন ধারার এই গল্প বর্ণনার কৌশল দেখে। কেমন যেন একটা ঘোর লাগা পরিবেশ তৈরি করেছে সে। প্রতিটি গল্পের প্লটে নিজেকে স্থায়ী বাসিন্দা মনে হয়েছে আমার। গল্পের শিরোনাম গুলো অদ্ভুত "পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা, একটি হাতের সন্ধান চেয়ে বিজ্ঞাপন, আমার মা বেশ্যা ছিলেন, আত্মহত্যা করার জন্য লোকটা মরেনি, ভিজে যাওয়া শব্দগুলো, পেছন ফিরে তাকিয়ে থাকা পথ, ছেলেটি বোমা হামলায় বেঁচে গিয়েই মরল, গেরিলা দাফন, বিয়েবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ, মিডিয়া ভার্সেস নোবডিসহ আরো অনেক অনেক গল্প আছে বইটিতে। একটি গল্পের কথা বলি, #একটি_হাতের_সন্ধান_চেয়ে_বিজ্ঞাপন আমার মত আপনারাও হয়তো অনেক বিজ্ঞাপনের কথা শুনেছেন, কিন্ত একটি হাতের সন্ধান চেয়ে বিজ্ঞাপন!
: একটি হাতের সন্ধান চেয়ে বিজ্ঞাপন দিতে চাই।
: কার হাত?
: কার হাত জানা থাকলে তো বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রয়োজন হতো না।
: তাহলে আপনি হাত নয় একজন ব্যক্তি সন্ধান করছেন? এক্ষেতে হাতের কোন বিবরণ দিতে চান? মানে ফর্সা না কালো, হাতটি লম্বা না মোটা? অন্যান্য কোন বিবরণ?
: কিছুই দেখিনি আমি। শুধু দেখেছি কটা লম্বা আঙুল আমার বেগুনি পাড়ের শাড়িটা ছাড়িয়ে দিচ্ছে।
: তার মানে শাড়ি কোথাও আটকিয়ে গিয়েছিল? একটা হাত সেটা ছাড়িয়ে দিয়েছে?
: আমি তারকাঁটা টপকাতে গেলে শাড়ির নিচের দিকটা আটকে যায়। খেয়াল করিনি। লাফ দিতে যাব তখনই একটা হাত এসে শাড়িটা ছাড়িয়ে দিল।
: আপনি শাড়ি পরে তারকাঁটা লাফাতে গেলেন কেন?
: আমরা ১৪৪ ধারা অমান্য করে মিছিল বের করেছিলাম। ব্যারিকেড ভাঙার সময় পুলিশের লাঠিচার্জে আমার পিঠের দিকটা টনটনে ব্যথায় ফেটে যাচ্ছিল। টিয়ারশেলে চোখদুটোর অবস্থাও ভাল না এরপরও পুলিশের সব রকম বাধা অমান্য করে আমরা
: কিন্তু সময়টা জানা প্রয়োজন।
উত্তর দিলেন
: সময়টা ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি...
লেখকের এমন দেশাত্ববোধ আমাদের দারুণ ভাবে অনুপ্রাণিত এবং আস্থাবান করেছে বললে অত্যুক্তি হবেনা।
২৬/২/১৯
