Mojaffor Hossain

Mojaffor Hossain

Mojaffor Hossain

Fiction Writer & Literary Critic
  • Home
  • About
    • Biography
    • About Me
  • Writings
  • Book Lists
  • Awards List
  • Books
  • Interviews
  • Donate
  • Reader-Opinion
  • Gallery
  • Contact me
অতীত একটা ভিনদেশ নিয়ে চ্যানেল আইয়ের মুখোমুখি

চ্যানেল আইয়ের হয়ে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন লেখক সাংবাদিক মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

 ‘অতীত একটা ভিনদেশ’ গল্পগ্রন্থের জন্য এ পুরস্কার পাচ্ছেন। বইটা লেখার পেছনের গল্প জানতে চাই।

মোজাফ্‌ফর হোসেন: বইটার গল্পগুলো বিভিন্ন সময় লেখা। তবে গ্রন্থভুক্ত করার সময় চেষ্টা করেছি যে গল্পগুলোতে অতীত বা ক্ষয়ে যাওয়া সময় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে সেগুলোকে নির্বাচন করার। যে সময়টা চলে যাচ্ছে, বা গেছে, সেই সময়টাকে উদযাপন করতে চেয়েছি, উদযাপনের স্বরটা কোথাও কোথাও হাহাকার করে উঠেছে। এই হাহাকারের কেন্দ্রে ছিল যে গ্রামে আমি বেড়ে উঠেছি সেই গ্রামটাকে হারিয়ে ফেলার বেদনা।

যে পুরস্কারটা পেলেন তার নামের সঙ্গে তুমুল জনপ্রিয় হুমায়ূন আহমেদের নাম জড়িত। ক্লাসিক্যাল ধারার লেখকগণ হুমায়ূন আহমেদকে স্বীকৃতি দিতে চান না। আপনি তাকে কিভাবে দেখেন?

মোজাফ্‌ফর হোসেন: প্রথমত আমি সাহিত্যের এই ধারা-বিভক্তির পক্ষে না। কারণ শিল্পের প্রত্যেকটা সৃষ্টিই যেমন স্বতন্ত্র আবার তেমনটি একই শিকড়ে প্রোথিত। শিল্প-সাহিত্যের স্বীকৃতি প্রদান করার ক্ষমতা কেবল মহাকাল রাখে। তবে মহাকালও যে সবসময় সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারে তাও না। হুমায়ূন আহমেদ আমার কাছে প্রিয় তার ছোটগল্পের জন্য। তার অধিকাংশ গল্প টনটনে ব্যথার কিন্তু মোড়ানো হয়েছে সরল আনন্দ দিয়ে। এটা করতে শক্তি লাগে। আমি মনে করি, সাহিত্যের কাজ হলো বায়বীয় একটা জগত তৈরি করা। সেই জগতের বাসিন্দারা বাস্তবের বাসিন্দাদের মতোই অমিত সম্ভাবনাময়ী। হুমায়ূন আহমেদের গল্পের সেই সম্ভাবনা দেখা যায়। তার চরিত্ররা সমাজের বাস্তবের চরিত্রদের হুবহু কপি-নির্মিতি না। যে কারণে তার চরিত্ররা প্রায়ই অদ্ভূত সব আচরণ করে। অস্বভাবী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে আমাদের চিনে নিতে সমস্যা হয় না তার গল্পের চরিত্রদের। আমরা সবসময় সাহিত্যকে ‘সিরিয়াস’ হতে হবে বলে বেঁধে দিই। জীবনমুখীতা বলতে জীবনের কষ্ট-বেদনার কথা বুঝি। কিন্তু আনন্দ-উল্লাসও কি জীবনের অংশ নয়? এই নিরস জীবনে বিনোদনের উৎস হিসেবে সাহিত্যের কি গুরুত্ব থাকতে পারে না? হুমায়ূন আহমেদের অনেক লেখা মনের ব্যায়ামস্বরূপ কাজ করে। এটাকেও আমি গুরুত্ব দিতে চাই।

জনপ্রিয় ধারায় না গিয়ে ক্লাসিক্যাল ধারায় কেন গেলেন?

মোজাফ্‌ফর হোসেন: আমি কোন ধারায় লিখি সেটা পাঠকই বলতে পারবেন। তবে লেখাটা আমার কাছে যেভাবে আসে আমি সেভাবে লিখি। আমি প্রত্যাশা করি, যত বেশি সম্ভব পাঠকের কাছে পৌঁছানোর। জনপ্রিয় হতে চাই সেই অর্থে। কিন্তু পাঠকের ওপর জোর সৃষ্টি আমরা কেউই করতে পারি না। আবার পাঠকের কথা ভেবে নিজের উপরও জোর দিতে পারি না।

আপনার গল্পে জাদুবাস্তব অনুষঙ্গের কথা উল্লেখ করেছেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। এটা কি সচেতন ভাবে এসেছে? পরাবাস্তব গল্পও তো লিখেছেন, জাদুবাস্তবতার সাথে পরাবাস্তবতার পার্থক্য আসলো কোথায়?

মোজাফ্‌ফর হোসেন: সচেতনভাবে এসেছে, আবারও আসেওনি। আমরা যে জীবন যাপন করি সেখানে নানারকম অতিপ্রাকৃত বা জাদুময় ঘটনার উপস্থিতি ঘটে। এগুলো লোকবিশ্বাস, জনশ্রুতি, পুরাণ ও ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে আসে। আমি ছোটবেলায় দেখেছি, তালের পিঠা খেয়ে সন্ধ্যায় বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে যেতে বারণ করা হতো ভূতে ধরবে বলে। আমরা ভয়ে সন্ধ্যায় তালের পিঠা খেয়ে বের হতাম না। আমাদের বাড়ির পেছনে প্রকাণ্ড আমগাছটিতে বুড়ো একটা জ্বিন থাকত। অনেকে দেখেছে। এগুলো আমি হয়ত বিশ্বাস করি না, কিন্তু আমার গল্প সবসময় আমার বিশ্বাসের তোয়াক্কা করবে না। এটা অসচেতনতার অংশ। কিন্তু সাহিত্যে যে জাদুবাস্তবতার কথা বলা হচ্ছে সেখানে কিছুটা সচেতন হতে হয়। এটা একটা লিটারারি টেকটিক। গল্পকে আরও উপভোগ্য করে তুলতে; কখনো কখনো আরও বিশ্বস্ত করে তুলতে এই ন্যারেটিভ শৈলির আশ্রয় নিতে হয়েছে। তাছাড়া কল্পনার পরিধিকে এটা আরও বিস্তৃত করে মেলে ধরে। এটা গেল জাদুবাস্তবতার বিষয়। পরাবাস্তবতার বিষয়টি ঘটনার অন্তর্বয়ান থেকে আসে। এটা খুব পরিকল্পনা করে করা যায় না। কারণ এখানে কাল-পাত্র-স্থান সব ভেঙে পড়ে। সচেতন নির্মাণ বলে কিছু থাকে না। যেমন ‘না লিখতে পারা গল্পটা’ স্বপ্নবাস্তবতার গল্প। এই ঘোরটা কোনো একটা সময় আচ্ছন্ন করে গল্পটা আমাকে লিখিয়ে নিয়েছে।

জাদুবাস্তবতার সাথে পরাবাস্তবতার পার্থক্য নিয়ে যদি বলতে হয় তাহলে মার্কেসের কথা চলে আসে। জাদুবাস্তবতার কৌশল নিয়ে তিনি বলছেন : ‘যখন আপনি বলবেন, হাতি আকাশে উড়ছে, মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আপনি যদি বলেন, ৪২৫টা হাতি আকাশে উড়ছে। লোকজন আপনাকে বিশ্বাস করলেও করতে পারে।’অর্থাৎ, মার্কেস যেটা বোঝাতে চাচ্ছেন, অবাস্তব ঘটনাকে বিশ্বাসযোগ্য বা বাস্তব করে তুলতে হলে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার ভেতর চলে যেতে হবে। পাঠক তখন ধরে নেবেন বিষয়টি সত্যিই ঘটছে বা ঘটেছে। অন্যদিকে পরাবাস্তবতায় চেতন এবং অবচেতনের একটা বন্ধন গড়ে ওঠে। অন্যকথায়, স্বপ্নের সঙ্গে জাগতিক বিষয় যুক্ত হয়ে স্বপ্নবাস্তবতার সৃষ্টি করে। ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব থেকে জানা যায়, মানুষের মনের সিংহভাগই থাকে অবচেতন অংশে। এই অংশটি মানুষের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে সেখান থেকে নানা ভাবনা বা ভাবনার টুকরো টুকরো বিষয় মানুষের চেতনার জগতে চলে আসে। বিষয়টা ভীষণভাবে ব্যক্তিগত। আমার মনে হয়, এই আলোচনায় এর বেশি বলা সমীচীন হবে না।

আপনার গল্প থেকে যদি জানতে চাই- ছুঁয়ে দেখা জীবন গল্পটিকে আপনি কি উত্তরাধুনিক গল্প বলবেন নাকি পরাবাস্তব গল্প?

মোজাফ্‌ফর হোসেন: দুটো আঙ্গেল থেকেই গল্পটিকে ব্যাখ্যা করা যায়। উত্তরাধুনিক এই কারণে যে এই গল্পে কোনো কেন্দ্র নেই। জ্যাক দেরিদা যে Freeplay of Structure-এর যে ধারণা দিয়েছেন, তা এখানে ঘটেছে। উত্তরাধুনিক সাহিত্যে মেটান্যারেটিভ পরিচিত একটি টার্ম। জঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার বলেছিলেন, ‘পোস্টমডার্ন মিনস ইনক্রেডুলিটি টোয়ার্ডস মেটান্যারেটিভ’। উত্তরাধুনিক সাহিত্য সম্পর্কে আরও যা বলা হয় : A story in which the readers of the story itself force the author to change the story। এই গল্পে সেটা ভীষণভাবে ঘটেছে। গল্পের চরিত্র অতীতে গিয়ে তার বর্তমান বদলে ফেলছে। অন্যদিকে পরাবাস্তব এই কারণে যে, এই গল্পের কোনো সেটিং নেই। টাইম ফ্রেম বলে কিছু নেই। ঘটনা ঘটছে ব্যক্তির মস্তিস্কে।

আপনি যেমন ‘ভ্যাদা কবির প্রস্থান কবিতা’র মতো নির্মিতিপ্রধান গল্প লিখেছেন আবার তেমন ‘একটি নদীর গল্প’ গল্পের মতো গল্পপ্রধান গল্পও লিখেছেন। আবার ‘বাঁশিওয়ালা মজ্জেল’ গল্পে নির্মিতি ও গল্প দুটোই আছে। এই সমন্বয়টা কিভাবে করেন?

মোজাফ্‌ফর হোসেন: এটা গল্পই অনেক সময় নির্ধারণ করে দেয়। আমি দেখতে চাই যে গল্পটা খুব সরল, যেখানে ঘটনা যা ঘটছে তা খুব জানা, সেখানে নির্মিতির বিষয়টির দিকে খেয়াল দিই। যেমন, বাঁশিওয়ালা মজ্জেল ঘটনাপ্রধান হলেও ঘটনাটি আমাদের অজানা নয়। একজন বাঁশিওয়ালা মৌলবাদের উত্থানের সাথে সাথে তার বাঁশিবাজানোর অধিকার হারাচ্ছে। গল্পটা স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড বললে পাঠক আগ্রহ হারাতো। কিন্তু যখন দুজন মৃত মানুষের মুখ থেকে গল্পটা তুলে আনা হলো তখন দেখা গেল পাঠক বিষয়টি ধরতে কয়েকবার পাঠ করছে। গল্পটি প্রথম আলোয় প্রকাশিত হওয়ার পর অনেকে বলেছেন একাধিকবার পাঠ করেছেন বিষয়টি বুঝতে। অন্যদিকে ‘একটি নদীর গল্প’ দেশভাগের গল্প। আমি চাইনি নির্মিতির ধাঁধায় ফেলে মূলগল্প থেকে পাঠকদের সরিয়ে আনতে। অন্যদিকে ‘ভ্যাদা কবির প্রস্থান কবিতা’ গল্পে যেহেতু কেন্দ্রীয় কোনো গল্প নেই, তাই পাঠককে কোথায় আঁটকে রাখার দায় সেখানে ছিল না।

দেশভাগের দুটো গল্প আছে। একটি আছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। আপনি তো মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরের প্রজন্ম। এই গল্পগুলো কি দায় থেকে লেখা?

মোজাফ্‌ফর হোসেন: মুক্তিযুদ্ধ এবং দেশভাগের মর্মান্তিক ইতিহাস আমি পাঠ করেছি মায়ের চোখে, বেড়ে ওঠার মুহূর্তে। তখন আমার চারিদিকে ইতিহাসের ভুল পাঠ চলছিল। গাঁয়ে জেনেছি, দেশটা পাকিস্তান থাকলেও ভাল হত। ৯৯-এর বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তান পরাজিত হওয়াতে দেখেছি পাড়ার ছেলেরা মন খারাপ করে বসে আছে। বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ হতে শুনিনি, শুনেছি মেজর জিয়ার নাম। কিন্তু মা বলতেন বঙ্গবন্ধুর কথা। একাত্তরের সেই ভয়াবহ রাতগুলোর কথা। গ্রামে পাক মিলিটারি এসেছে বলে খবর হলেই ছুটে পালাতেন মাঠে বাঁশবাগানের ভেতরে। সেখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধের গল্পটি লেখা। মা প্রায়ই কাঁদতেন ওপারে থেকে যাওয়া আমার বড়খালার জন্যে। নানা এপারে চলে আসলেও খালার পরিবার আসেনি। নানা মারা যাওয়ার সময় বলেছিলেন তাঁর কবরে ওপারে তাঁর বাবা-মায়ের কবরের অথবা ভিটের মাটি এনে দিতে। মা এসব কথা বলে একা একা কাঁদতেন। দেশভাগের গল্প লেখার প্রেরণা সেখান থেকেই। তাছাড়া ‘একটি নদীর গল্প’ গল্পে আমি বানিয়ে কিছু লিখিনি। আমার বড়বোনের শ্বশুর, মৃত্যুর আগে ওভাবে দেশ দেশ করতে করতে পাগল হয়ে গেলেন। অথচ তার জন্ম-বেড়ে ওঠা সব এখানেই।

আর গল্পগুলো আমি কোনো দায় থেকে লিখেছি বলে মনে করি না। বরং একটা চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করেছি। আপনি যদি কোনো সত্য জেনে যান, আপনি যতক্ষণ না সেটি প্রকাশ করছেন ততক্ষণ ভেতর থেকে চাপ অনুভব করবেন। তাই আমি বলি, সত্য প্রকাশ মানুষ মানবিক দায় থেকে নয়, নিজের ভেতরের চাপমুক্তির তাড়না থেকে করে। অর্থাৎ সত্য আপন শক্তি দিয়েই প্রকাশিত হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গল্প লেখার মূলবিষয়টি আপনি কিভাবে নিয়েছেন?

মোজাফ্‌ফর হোসেন: ইতিহাসের পুনঃলেখন বা অনুলেখন সাহিত্যের কাজ না। ঐতিহাসিক ঘটনার নতুন নতুন মাত্রা আবিষ্কার করা আর প্রচলিত বা প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস রচনা করা আলাদা কথা। সালমান রুশদি যে বলছেন, ‘পৃথিবীর একটা ব্যাপক অংশ আমার গল্পে চলে আসে। এর কারণ এই না যে আমি রাজনীতি নিয়ে লিখতে চাই। এর কারণ হলো, আমি জনগণ নিয়ে লিখতে চাই।’ তবে ঐতিহাসিক দিক পর্যবেক্ষণ করা আর ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতের বিশদ বয়ান এক কথা নয়। কুন্দেরা ইতিহাসের যতটা সম্ভব কম উপাদান নিয়ে গল্প-উপন্যাস নির্মাণ করার পক্ষপাতী। আমিও তার বিশ্বাসে বিশ্বাসী। ইতিহাসকে আমি তুলে আনতে চাই ভবিষ্যতের ইঙ্গিত হিসেবে।

‘লাশটি জীবিত’ গল্পটি বর্তমান সময়ের। নগরে নির্মাণাধীন ভবনে একটি লাশ ঝুলে আছে শ্রমিকের। মিডিয়া ও প্রশাসন সেটা নিয়ে যে ভূমিকা পালন করছে তা আমাদের শিউরে তোলে। এটা কি সম্ভব?

মোজাফ্‌ফর হোসেন: খুব চিরায়ত, চিরন্তন গল্পটা লিখে ফেলা সাহিত্যের কাজ না। অর্থাৎ দশজন লিখলে যদি দশরকম সম্ভাবনা বের হয়ে না আসে তবে সেটা গল্প বটে কিন্তু সাহিত্য না। অর্থাৎ সাহিত্যের প্রধান কাজ হলো, ব্যক্তির সম্ভাবনাগুলো খুঁজে খুঁজে বের করা। আমি সেই সম্ভাবনার কথা এখানে বলেছি। একবিংশ শতকের মানুষ চারটা বায়বীয় শক্তির কাছে অসহায়। এক. পূঁজিবাদ, দুই. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, তিন. প্রযুক্তি-শক্তি এবং চার. মিডিয়াশক্তি। এই চার শক্তির কাছ থেকে একজন মানুষ মরে গিয়েও মুক্তি পাচ্ছে না। পরিবারটি অসহায় বলে নয়, এই বায়বীয় শক্তির কাছে বিত্তশালী এবং ক্ষমতাবান লোকেরাও সমানভাবে বন্দি।

আপনার গল্পে মেহেরপুরের আঞ্চলিক ভাষা এসেছে। এটা কি সচেতন প্রয়াস?

মোজাফ্‌ফর হোসেন: কারণ আমার গল্পের ভূগোল হলো মেহেরপুর। তাই ডায়লগে মেহেরপুরের ভাষা ব্যবহার করতে হয়েছে। মেহেরপুরের ভাষা শিল্প-সাহিত্যে সেভাবে আসেনি। অগ্রজ কথাশিল্পী রফিকুর রশীদ চেষ্টা করছেন। আমার মনে হয়েছে আমারও করা উচিত। মুখের ভাষা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। আমি আমার সাহিত্যের মধ্য দিয়ে তার একটা অবস্থাকে ধারণ করতে চাই। তাছাড়া আমি মানভাষাতে লিখলেও আমার অস্তিত্বের অংশ হচ্ছে ওইভাষা। ওটা ভুলে গেলে আমার চিন্তা করার শক্তি খর্ব হয়ে আসবে। আমি নিজের প্রয়োজনেই ভাষাটা বাঁচিয়ে রাখতে চাই।

‘অতীত একটা ভিনদেশ’ গ্রন্থের গল্পগুলোতে কতটা নির্মিতি, কতটা আপনার বাস্তব জীবন থেকে নেয়া?

মোজাফ্‌ফর হোসেন: এখানে নির্মিতি এবং বাস্তবতা এমনভাবে লেপ্টে আছে যে পৃথক করা মুশকিল। যেমন ধরুন, বাঁশিওয়ালা মজ্জেল গল্পের মজ্জেলের জীবনটা আমার গ্রামের মজ্জেল থেকে নিয়েছি, কিন্তু তার পরিণতিটা আমার সৃষ্টি। গল্পের মজ্জেল মৃত হলেও, গাঁয়ের সে মজ্জেল এখনো জীবিত। ‘ভ্যাদা কবির প্রস্থান কবিতা’ গল্পে ভ্যাদা কবির সব কিছুই আমার নির্মিতি কিন্তু ভূগোলটা নিয়েছি নিশ্চিন্তপুর গ্রাম থেকে। ভ্যাদা নামটিও আমার সৃষ্টি নয়। আমার বড়চাচার নাম ভ্যাদা। মিছরি আমার চাচাতো ফুফুর নাম। গোসল করার পর কেউ যদি পাটখড়ি ছুঁয়ে দিত তার শাড়িতে, উনি আবার গোসল করতেন। পুকুর থেকে ফেরার পথে কোনো কোনো দিন উনাকে পাঁচ ছয়বার গোসল করতে হত। তার সেই অস্বভাবী চরিত্রটা আমি ধার নিয়েছি এখানে। পূর্বেই বলেছি, ‘একটি নদীর গল্প’ গল্পটি আমার বোনের শশুরের জীবন থেকে নেয়া। এর বিপরীতে দেশভাগের পর ভারতে চলে যাওয়া একজন ব্যক্তির অনুভূতি নিয়ে লেখা হয়েছে ‘ঘুমপাড়ানো জল’ গল্পটা। ‘কেবল কথা বলতে চেয়েছিলাম’ গল্পটি আমার বাল্যপ্রেমের। মুক্তিযুদ্ধের গল্প ‘যেখানে যুদ্ধের বিকল্প ছিল না’ গল্পে প্রচ্ছন্নভাবে আমার মা-দাদি আছেন। এভাবে প্রতিটা গল্পেই আমার জীবন-পারিপার্শ্বিক জনজীবন কোনো না কোনোভাবে আছে। কোথাও হয়ত কিচ্ছু নেই, কিন্তু বাড়ির পেছনের বটগাছটি আছে।

শেষ প্রশ্ন, অতীত কেন একটা ভিনদেশ?

মোজাফ্‌ফর হোসেন: স্থানচ্যুতির বিষয়টা আমাকে সবসময় পীড়া দেয়। যখন ৭ম শ্রেণির ছাত্র তখন গ্রাম ছেড়ে মেহেরপুর শহরের স্কুলে ভর্তি হয়েছি। মাধ্যমিকে চলে এসেছি কুষ্টিয়া। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছি। এখন বাস করছি রাজধানী শহরে। স্থান বদলের সাথে সাথে একটু একটু করে আমি আমার গ্রাম থেকে সরে এসেছি। একদিন হঠাৎ করে অনুভব করলাম, আমি যে গ্রামটিকে ভেতরে লালন করি সেটি আর কোথাও নেই। প্রযুক্তি বিপ্লব এবং নগর সভ্যতার বিস্তার আমার গ্রামটিকে কেড়ে নিয়েছে। গ্রামটিও এখন কেন্দ্রের অংশ হয়ে উঠেছে। এখন আর সেখানে একজনের মৃত্যুতে সকলে কাঁদে না। নারী-পুরুষ একসঙ্গে গল্প করতে করতে পুকুরে গোসল করে না। ছেলে-মেয়েরা গোল্লাছুট খেলে না। কিশোরীরা আমগাছে ওঠে না। এখন সেই গ্রামটি কেবল আমার স্মৃতিতে আছে। ফলে আমি পৈতৃক ভিটেতে দাঁড়িয়েই হোমসিকনেসে ভুগছি। অতীত এভাবেই আমার কাছে ভিনদেশ হয়ে উঠেছে।

 

সাক্ষাৎকারটি মূল সাইটে পড়তে ক্লিক করুন

© All Rights Reserved By: Mojaffor Designed & Developed By Webcode Technology