কুন্দেরা উপন্যাস ভাবনা
Published On July 13, 2023উপন্যাস নিয়ে কুন্দেরা বলছেন, ‘প্রত্যেক উপন্যাস আসলে সত্তাময়। আপনি যে মুহূর্তে একটি কাল্পনিক চরিত্র সৃষ্টি করবেন, তখনই আপনাকে মুখোমুখি হতে হবে এই প্রশ্নের, সত্তা কি? এটাকে কিভাবে বোঝা যাবে?’ অর্থাৎ উপন্যাস সৃষ্টি মানে একটা সত্তা সৃষ্টি করা। সেই সত্তাটি হবে স্বতন্ত্র। নতুন এক জীবনের আজ্ঞাবহ। কেননা জীবনকে তিনি দেখছেন এই ভাবে, ‘আমরা একবারই জন্মাই। আমরা কখনো পূর্বজন্মের অভিজ্ঞতা দিয়ে জীবন শুরু করতে পারি না। আমরা যৌবন কেমন না জেনেই শিশুকাল ত্যাগ করি। বিবাহিত জীবন কেমন না জেনেই বিয়ে করি। … কাজেই মানুষের জগৎটাই হল অনভিজ্ঞতাময়।’ কুন্দেরা মনে করছেন, একজন মানুষের অস্তিত্ব তার ভেতরেই লুপ্ত, বিকশিত। মানুষের সমষ্টির অভিজ্ঞতার সাথে ব্যক্তির ব্যষ্টিক অভিজ্ঞতার বিস্তর ফারাক। উপন্যাসের চরিত্রগুলো সমষ্টির অংশ হয়েও সম্পূর্ণ আলাদা। আত্মচেতনার মগ্নতায় ভর করে নিজস্ব সত্তান্বেষণ করাই তাদের লক্ষ্য। যে কারণে তিনি উপন্যাসকে মানব অস্তিত্ব সন্ধানের অন্যতম মাধ্যম বলে মনে করছেন। উপন্যাসের কাজই হল কল্পিত চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে বিচ্ছুরিত অস্তিত্ববাদের ওপর ধ্যানারোপ করা। মানুষ যেহেতু তার অতীতকে বদলাতে পারে না, সেহেতু সে সবসময় চায় তা পুনঃসৃষ্টি করতে। এই পুনঃসৃষ্টি আসে নতুন নতুন সম্ভাবনা নিয়ে। এই চাওয়াটাই তাকে উপন্যাস লেখার দিকে চালনা করে থাকে। জ্ঞানই হল উপন্যাসের একমাত্র নৈতিকতা। অনাবিষ্কৃত কিছুকে আবিষ্কার করাও উপন্যাসের নৈতিকতার মধ্যে পড়ে। বিস্তারিত অর্থে, উপন্যাস হল এক মহৎ গদ্য সৃষ্টি করা যার ভেতর দিয়ে একজন ঔপন্যাসিক অস্তিত্বের আদি থেকে অন্ত অনুসন্ধান করে চলেন। যে সকল উপন্যাসের ভেতর এই অনুসন্ধানের সন্ধান মেলে না কুন্দেরা তাকে বলছেন ‘অনৈতিক’ উপন্যাস।
মানুষ ভাবে আর ঈশ্বর হাসেন। হাসেন কারণ মানুষ যত ভাবে সত্য ততই দূরে সরে যায়। কুন্দেরা বলছেন, ঈশ্বরের এই হাসি থেকেই জন্ম নেয় ইউরোপের উপন্যাস। আধুনিক যুগের বস্তুবাদী চিন্তাকে নিন্দা করে তিনি বলেন যে, আধুনিক যুগের প্রতিষ্ঠাতা শুধু দেকার্তে নন, সার্ভান্তেসও। কেননা ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁরা ইউরোপের একই সমস্যার সাক্ষী। কুন্দেরার মতে, ‘যদি শিল্পের কাজই হয় বিস্মৃত অতীতকে ঘেঁটে দেখা তাহলে সার্ভান্তসের হাত দিয়েই ইউরোপীয় শিল্পের অবয়ব দাঁড়িয়েছে।’ ইউরোপীয় আধুনিক উপন্যাস নিজস্ব ধারায় অস্তিত্বের নানান দিক উন্মোচন করেছে। কুন্দেরা এ-পর্যায়ে ইউরোপীয় উপন্যাসের ঐতিহ্যের ওপর বিশদভাবে আলোকপাত করেছেন—বালজাক মানুষের ঐতিহাসিক অস্তিত্বকে আবিষ্কার করেছেন, ফ্লবেয়ার মানুষের দৃষ্টির সামনের অদেখা জগতকে উঠিয়ে এনেছেন। তলস্তয় মানুষের আচরণগত দিক ফুটিয়ে তুলেছেন, প্রুস্তের মাধ্যমে খয়ে যাওয়া অতীত আর জয়েসের মাধ্যমে অন্তর্মুখী বর্তমানে প্রবেশ করেছে উপন্যাস। টমাস মানের মাধ্যমে উপন্যাস অতীত-পুরাণকে বর্তমানের চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করেছে। রিচার্ডসন মানুষের অন্তর্জলের ঘটনা উন্মোচনের দিকে মনোনিবেশ করেছেন।
উপন্যাসের ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কুন্দেরা বলছেন যে, উপন্যাসের শুরু ইউরোপে। চূড়ান্ত ভাঙ্গা-গড়াটাও সেখানে। বিশ্বাস যেদিন হালকা হয়ে গেল সেদিনই দন কিহোতে নিজের চেনাজানা জগত ছেড়ে অচেনায় পা বাড়ালো—এভাবেই জন্ম নিতে থাকলো চূড়ান্ত সত্য ভেঙ্গে অনেকগুলো আপেক্ষিক সত্যের। জন্ম নিলো উপন্যাস। উপন্যাস অনেকগুলো আপেক্ষিক সত্যের মাঝে যে অস্পষ্টতার প্রজ্ঞা তা থেকেই নিজের প্রজ্ঞাকে বের করে আনে। তাই তো সার্ভেন্তেসের কাছে কাজটি বীরত্বখোঁচিত বলে মনে হয়। কিন্তু কুন্দেরা বলছেন—‘পাঠক যেহেতু সর্বোচ্ছ স্বর্গীয় বিচারের রায় ছাড়া নিজের চোখে কিছুই দেখতে পায় না। এই অক্ষমতার কারণে উপন্যাসের অনিশ্চয়তার প্রজ্ঞা তাদের কাছে অধরাই থেকে যায়।’
উপন্যাসের মনোজাগতিক পরিচয় দিতে গিয়ে কুন্দেরা বলছেন যে, উপন্যাস ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের সাথে জড়িত। মানুষ যেহেতু জগতের ঘটনার মধ্যে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায় না, তাই তাকে ফিরে আসতে হয় অন্তর্জগতে। আধুনিক উপন্যাস সেই কাজটিই করতে লাগলো। কুন্দেরা তাঁর উপন্যাসের ভিত্তি হিসেবে দাড় করিয়েছেন ‘চিন্তাপ্রবণ প্রশ্ন’কে। যে সকল দার্শনিক শিল্পকে দর্শন ও তাত্ত্বিক ধারার পরবর্তী রূপ বলে মনে করেন, তাদের সাথে দ্বিমত কুন্দেরার। কেননা তিনি বলছেন—‘উপন্যাস ফ্রয়েডের পূর্বেই অচেতনতা নিয়ে কথা বলেছে, মার্ক্সের পূর্বে শ্রেণিসংগ্রামের কথা বলেছে, ইন্দ্রিয়-তাত্ত্বিকদের পূর্বে ইন্দ্রিয়-তাত্ত্বিক বিষয়ে কথা বলেছে।’
চরিত্রের অতি বর্ণনা কমিয়ে কুন্দেরা জোর দিয়েছেন পরিস্থিতি বর্ণনাতে। কাজেই চরিত্রগুলো দেখতে কেমন, তাদের অতীত কি এগুলো খুব কমই জানা যায় তাঁর উপন্যাসে। একই কাজ করেছেন কাফকা ও মুসিল। তাঁদের তৈরি চরিত্ররা তলস্তয় কিংবা দস্তয়ভস্কির চরিত্রদের মতো বিন্যস্ত না। এক্ষেত্রে অনেকের ধারণা, বর্ণনার ঘাটতি থাকলে চরিত্রের জীবন ঘনিষ্ঠতা কমে। উপন্যাসের ক্ষেত্রে কুন্দেরা সেটা অপরিহার্য বলে মনে করছেন না। তিনি বলছেন— ‘উপন্যাসের চরিত্র বাস্তবের মানুষের ছদ্মরূপ হতে পারে না। চরিত্র কাল্পনিক এবং পর্যবেক্ষণমূলক আত্মপ্রতিমা।’ সব বলে না দিলে পাঠকদের সুবিধা থাকে নিজের মতো করে চরিত্রের অবয়ব নির্মাণ করার। চরিত্র হয়ে ওঠে আংশিক লেখক ও আংশিক পাঠকের কল্পনার যৌথ ফসল।
অস্তিত্বনির্ভর উপন্যাসের সামাজিক-ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কুন্দেরা বলছেন যে, তিনিও হেইদেগারের মতো বিশ্বাস করেন মানুষের সাথে পৃথিবীর যে সম্পর্ক সেটা অভিনেতার সাথে মঞ্চের যেমন সম্পর্ক তেমন নয়। সম্পর্কটা কাছিমের সাথে তার খোলসের মতো। মানে বিশ্ব হলো মানুষেরই অংশ বিশেষ। এজন্যে বিশ্ব বদলালে মানুষের অস্তিত্ব বদলাবে। তবে ঐতিহাসিক দিক পর্যবেক্ষণ করা আর ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতের বিশদ বয়ান এক কথা নয়। কুন্দেরা ইতিহাসের যতটা সম্ভব কম উপাদান নিয়ে উপন্যাস নির্মাণের পক্ষপাতী। ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখাটাকে তিনি খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করছেন না। কারণটা তিনি ব্যাখ্যা করছেন এই বলে– ‘ঐতিহাসিক পরিস্থিতি চরিত্রের জন্যে শুধু নতুন অস্তিত্ব তৈরি করে না। বরং অস্তিত্বের প্রেক্ষাপটে ইতিহাসকে বুঝতে হয়, বিশ্লেষণ করতে হয়।’ যা ঘটে গেছে তা ইতিহাস। সেখান থেকে যে সম্ভাবনার আলো বিচ্ছুরিত হয় সেটাই অস্তিত্ব। উপন্যাসের কাজ সেই বিচ্ছুরিত সম্ভাবনাকেই পর্যবেক্ষণ করে দেখা বা দেখানো।
আমার ”কুন্দেরা উপন্যাস ভাবনা” প্রবন্ধের অংশ বিশেষ

Leave a Comment