Mojaffor Hossain

Mojaffor Hossain

Mojaffor Hossain

Fiction Writer & Literary Critic
  • Home
  • About
    • Biography
    • About Me
  • Writings
  • Book Lists
  • Awards List
  • Books
  • Interviews
  • Donate
  • Reader-Opinion
  • Gallery
  • Contact me
Writings Details

ভাই গিরিশচন্দ্র সেনই কোরআনের প্রথম অনুবাদক

Published On October 24, 2024
Mojaffor Hossain
Mojaffor Hossain
Contributor

ভাই গিরিশচন্দ্র সেনই কোরআনের প্রথম অনুবাদক

মুসলমান ভাই ও বোনরা আমার, মিথ্যাচারে ইসলামের সৌন্দর্য বাড়ে না কমে??

‘ভাই গিরিশচন্দ্র সেন কোরআন মাজীদের প্রথম অনুবাদক নন, তিনি ছিলেন প্রকাশক। একটি ভুল প্রচারের নিরসন’—শিরোনামের একটি পোস্ট ফেসবুক কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া ঘুরে বেড়াচ্ছে। কয়েক বছর থেকে এই অপ্রচার শুরু হয়েছে। সম্ভবত ২০২০ সালে রাজাকারের পত্রিকা দৈনিক সংগ্রাম’র রেফারেন্স দিয়ে কেউ এটা লিখে ছাড়ে। লোকজন সেই লেখা হুবহু কপি পেস্ট করে এখনো চালিয়ে ফেসবুকে। কারো মনে সত্য জানার আগ্রহ নেই। যেন এই অপপ্রচার বিশ্বাস করার জন্যই এতদিন তিনি বেঁচে ছিলেন, এবার মরেও শান্তি!!

পোস্টের শেষে লেখা আছে: “যত পরিমানে সম্ভব সংগৃহীত পোস্টটি শেয়ার করুন অনেকেই ভুলের মধ্যে ডুবে আছে তাদের কে জানার সুযোগ করে দিন।” এই সংগৃহীত পোস্টের জন্মদাতা কে কারো জানা নেই, কিন্তু শিক্ষিত অশিক্ষিত সব মুসলমান ভাইরা সেটা শেয়ার কিংবা কপিপেস্ট করছেন এমন আনন্দচিত্তে।

আসলে এটা সম্পূর্ণ প্রপাগান্ডামূলক পোস্ট।

পোস্টটিতে বলা হয়েছে— “সর্বপ্রথম ১৮০৮ সালে বাংলা ভাষায় কুরআন শরীফের আংশিক অনুবাদ করেন মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া। এরপর বাংলা ভাষায় কুরআন শরীফের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করেন মৌলভী নাঈমুদ্দীন ১৮৩৬ সালে। গিরিশচন্দ্র সেন শুধু উক্ত অনুবাদকে পুস্তক আকারে সন্নিবেশ করেছেন, গিরিশচন্দ্র হচ্ছেন প্রকাশক।”

মৌলবী নইমুদ্দীন জন্মগ্রহণ করেন ১৮৩২ মতান্তরে ১৮৩৮ সালে! তাহলে কিভাবে তিনি ১৮৩৬ সালে কুরআনের অনুবাদ করলেন!? হ্যাঁ, তিনি পরবর্তী সময়ে করেছিলেন, তবে পূর্নাঙ্গ না, অংশবিশেষ। অনুবাদ শেষ করার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অধ্যাপক ড. মোফখ্‌খার হুসেইন খান তাঁর ‘পবিত্র কুরআন প্রচারের ইতিহাস ও বঙ্গানুবাদের শতবর্ষ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন—‘মওলানা নঈমূদ্দীন নিজ বাসস্থান শুরুজে এন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর শেষ কথা ছিল : “আফছোছ! কোরান শরীফের তরজমা শেষ করে যেতে পারলাম না।”’ (পৃষ্ঠা-৬১)

নইমুদ্দীনের মৃত্যুর পর অনেক বছর পর তাঁর পুত্ররা ২৩ পারা পর্যন্ত অনুবাদ প্রকাশ করেছিলেন। তার পুত্ররা উদ্যোগ নিলেও তাঁরাও অবশিষ্টাংশ অনুবাদ করে যেতে পারেননি।

ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের আগেও বেশ কয়েকজন কুরআনের বঙ্গানুবাদের কাজে হাত দিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলোর কোনটিই পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ছিল না। গিরিশচন্দ্র সেনই সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় কুরআনের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করতে সক্ষম হন। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে তিনি এই অনুবাদের কাজ শুরু করে ১৮৮৫ সালে শেষ করেন।

ভাই গিরিশচন্দ্রের বাংলা তরজমার কয়েক খণ্ড প্রকাশ পাওয়ার পরই মুসলিম সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ কেউ তাকে হত্যার করারও হুমকি দেন। অপরাধ, বিধর্মী হয়ে মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ অনুবাদ করা। তবে অধিকাংশ মুসলমানই গিরিশচন্দ্রকে অভিনন্দন জানান। কলকাতা মাদ্রাসার দুজন আলেম তাঁকে ১৮৮২ সালের ২ মার্চে অভিনন্দন জানিয়ে পত্র লিখেছিলেন। এই প্রশংসাপত্র সমকালীন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় এবং গিরিশচন্দ্রের অনূদিত কুরআনের প্রথম খণ্ডের শুরুতেও সংযোজিত হয়।

গিরিশচন্দ্র সেনের এই অসামান্য কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তখন তাঁকে ‘মৌলবী’ এবং ‘ভাই’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ভাই গিরিশচন্দ্র সেন একেশ্বরবাদী ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী ছিলেন, সেজন্যই তাঁর অনূদিত কুরআনেও ব্রাহ্মধর্মের আকিদা-বিশ্বাসের প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে। গিরিশচন্দ্র সেন তাঁর অনুবাদে ‘আল্লাহ্’ শব্দকে কখনো ঈশ্বর, কখনো বা পরমেশ্বর বলে অনুবাদ করেছেন!

পোস্টটিতে আরো দাবি করা হয়েছে যে, গিরিশচন্দ্র সেন আরবি জানতেন না, আরবি ব্যাকরণ জানতেন না! এটিও অপপ্রচার। গিরিশচন্দ্র সেন নিজেই তাঁর আত্মজীবনীতে ৯০-৯৬ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বিস্তারিত তথ্যের অবতারণা করেছেন। এ সম্পর্কে গবেষক ড. মোহাম্মদ আলী খান তাঁর ‘ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের জীবন ও কর্ম’ গ্রন্থে লিখেছেন: ‘গিরিশচন্দ্র সেন ৪২ বছর বয়সে ১৮৭৬ সালে আরবি ভাষা শেখার জন্য লখনৌ যান। গিরিশচন্দ্র সেন সেখানে বিখ্যাত মৌলভী এহসান আলীর অধীনে আরবি ভাষা শেখা শুরু করেন। তাঁর কাছে আরবি ব্যাকরণ ও দিওয়ান-ই-হাফিজ শেখেন।’ (পৃষ্ঠা-৪৬) এরপর তিনি কলকাতার একজন মৌলবী ও ঢাকার নলগোলার অপর একজন মৌলবীর কাছেও আরবী সাহিত্য ও আরব ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনা করেন।

অর্থাৎ গিরিশচন্দ্র সেন আরবি জানতেন। তিনিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ কুরআন শরিফের অনুবাদক। তিনি প্রকাশক ছিলেন না। তার অনুবাদে পূর্ণাঙ্গ কুরআন শরিফ প্রথম প্রকাশিত হয় কলকাতার বিধানযন্ত্র প্রেসে, অনুবাদক হিসেবে তারঁ নাম উহ্য রেখে। ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রচ্ছদে অনুবাদকের নাম উল্লেখ করে। প্রকাশক ও মুদ্রক দেবযন্ত্রের মালিক গিরিশচন্দ্র চক্রবর্তী। গিরিশচন্দ্র সেন না কিন্তু।

গিরিশচন্দ্রের অনূদিত কোরআনের ৪র্থ সংস্করণের ভূমিকা লিখেছিলেন চিন্তক, রাজনীতিবিদ, ইসলামীশাস্ত্রজ্ঞ ও সমাজ সংস্কারক দৈনিক আজাদের প্রতিষ্ঠাতা ‘মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ। তিনি লেখেনে: ‘তিন কোটি মোসলমানের মাতৃভাষা যে বাংলা, তাহাতে কোরআনের অনুবাদ প্রকাশের কল্পনা ১৮৭৬ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত এ দেশের কোন মনীষীর দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে নাই। তখন আরবী-পার্শী ভাষায় সুপণ্ডিত মোসলমানের অভাব বাংলাদেশে ছিল না। তাঁহাদের মধ্যকার কাহারও কাহারও যে বাংলা সাহিত্যের উপরও যথেষ্ট অধিকার ছিল, তাঁহাদের রচিত বা অনুবাদিত বিভিন্ন পুস্তক হইতে তাহার অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু এদিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তাঁহাদের একজনেরও ঘটিয়া উঠে নাই। এই গুরু কর্তব্যভার বহন করার জন্য সুদৃঢ় সঙ্কল্প নিয়া সর্বপ্রথমে প্রস্তুত হইলেন বাংলার একজন হিন্দু সন্তান, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন—বিধান-আচার্য কেশবচন্দ্রের নির্দেশ অনুসারে। গিরিশচন্দ্রের এই অসাধারণ সাধনা ও অনুপম সিদ্ধিকে জগতের অষ্টম আশ্চর্য বলিয়া উল্লেখ করা যাইতে পারে।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মুজীবুর রহমানের পিএইচডি থিসিসের বিষয়বস্তু ছিলো ‘বাংলা ভাষায় কোরআন চর্চা’। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-কোরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সাবেক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল অদুদেরও পিইচডি থিসিস ‘বাংলা ভাষায় কোরআন চর্চা’। মোফাখখার হুসেইন রচিত গবেষণা গ্রন্থ ‘পবিত্র কুরআন প্রচারের ইতিহাস ও বঙ্গানুবাদের শতবর্ষ’। অধ্যাপক ড. সফিউদ্দিন আহমদের গবেষণা সমৃদ্ধ বইয়ের শিরোনামই হচ্ছে ‘কোরানের প্রথম অনুবাদক ভাই গিরিশচন্দ্র সেন’। এর প্রতিটিতেই একই সত্য প্রতিষ্ঠিত যে, প্রথম সম্পূর্ণ কোরআনের বাংলা অনুবাদক আর কেউ নন, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন।

এটাই তাঁর একমাত্র সৃষ্টিকর্ম নয়। আত্মজীবনীসহ তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৭৭। সম্ভবত তিনিই প্রথম হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনী লিখেছেন বাংলায়। তিনি বই লিখেছেন ইসলামের মনীষীদের নিয়ে। অনুবাদ করেছেন বিখ্যাত আরবি গ্রন্থ ‘মেস্কাতোল মসাবিহ’। এর নাম দিয়েছেন ‘হাদিস পূর্ব্ব বিভাগ’। এরপর হাদিসের অপর খণ্ড ‘হাদিস উত্তর বিভাগ’।

মুসলমান ভাইসকল, মিথ্যা লাখে লাখে প্রচারিত হলেও তাহা মিথ্যা। আর মিথ্যার আশ্রয়ে যে অহংবোধ বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করতে চান, তা আসলে দুর্বলতা হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পায়। লাখ লাখ মুসলমান থাকতে হিন্দু হয়েও গিরিশচন্দ্র সেন কুরআন অনুবাদ করেছেন, মোহাম্মদ (সা.)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনী লিখেছেন, তাঁকে ধন্যবাদ দেন। আর নিজের অন্ধত্ব ও কূপমণ্ডূকতার কারণে ধন্যবাদ দিতে না পারলে অন্তত মিথ্যাচার কইরেন না। মিথ্যাচার ইসলামের সঙ্গে যায় না বলেই আমার বিশ্বাস!

ঋণস্বীকার: কামরুল ইসলাম হুমায়ুন ও মো. সাফায়েতুজ্জামান। এবং সিরাজ উদ্দিন সাথী।

Leave a Comment Cancel reply

© All Rights Reserved By: Mojaffor Designed & Developed By Webcode Technology