Mojaffor Hossain

Mojaffor Hossain

Mojaffor Hossain

Fiction Writer & Literary Critic
  • Home
  • About
    • Biography
    • About Me
  • Writings
  • Book Lists
  • Awards List
  • Books
  • Interviews
  • Donate
  • Reader-Opinion
  • Gallery
  • Contact me
Writings Details

মৃতের ফেরা না-ফেরা

Published On June 26, 2023
Mojaffor Hossain
Mojaffor Hossain
Contributor

“আমার মৃত্যুতে কি এ জগতে কাহারো কোনো ক্ষতি হইয়াছে!” ভাবতে ভাবতে কবর থেকে উঠে বসেছি। গণিতের শিক্ষক, আক্ষরিক অর্থেই লাভ-ক্ষতি, সুদাসলের অংক কষতে কষতে মৃত্যু হয় আমার। নিজের মৃত্যুতে সংসারে বিরাট কিছু উলোটপালোট হয়ে যাবে এমন কিছু ভাবিনি আমি। কিন্তু কোথাও কি একটু ক্ষতি হয়ে যায়নি? স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক, বইয়ের কত নম্বর অংক শুনেই উত্তরটা বলে দিতে পারি। পারি মানে পারতাম। এখন পারি কিনা সেইটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা না। স্কুল কমিটি অনেকদিন থেকে নিয়োগের জন্য খালি পদ খুঁজছিলেন। এমন মূল্যবান একটা পদ আমি এতটা বছর নির্বোধের মতো ধরে বসেছিলাম ভেবে এখন নিজেরই লজ্জা লাগে। মৃতের লজ্জা কিংবা বিব্রত হওয়াতে অবশ্য জীবিতদের কিছু যায় আসে না।   

গত বছর যখন গণিতে নতুন ছেলেটাকে নিয়োগ দেওয়া হলো দশ লক্ষ টাকা নিয়ে, তখনই নিয়োগ কমিটির চেয়ারম্যান আর হেডমাস্টার আমাকে ডেকেছিলেন হেড মাস্টারের কক্ষে। আরো একজন প্রার্থী অপেক্ষা করছিল সমান অর্থ নিয়ে। স্ট্রং প্রার্থী, চেয়ারম্যানের মেয়ে। মেয়েটারই হতো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমপির সুপারিশ নিয়ে ছেলেটা চলে আসল। মাধ্যমিকে আমারই ছাত্র ছিল। অংকে মাঝেমধ্যে ফেল করলেও দেখতে বেশ, ভদ্র-বিনয়ী।

আপনার শরীরটা তো ভালো যাচ্ছে না! হেডমাস্টার নিজে হাতে আমার সামনে চা এগিয়ে দিয়ে বলল। বয়সে আমার জুনিয়র। শেষ দিকে আমার স্বাস্থ্যের খোঁজখবরটা খুব রাখত।

হ্যাঁ, বয়স হচ্ছে, ছোটোখাটো সমস্যাগুলো বড়ো হচ্ছে।

এত চাপ নিয়েন না, এই বয়সে এসে। স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান বলল। সে তো আমার পুত্রের বয়সী। পিটিয়েও আমরা নাইন ক্লাস পার করতে পারিনি। গত ইলেকশনের পর এমপির সুপারিশ এনে স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছে। পড়াশুনা না জানলেও লোক হিসেবে ভালো।

চাপ আর নিতে হয় না। এখন তো ছেলেমেয়েরা আগের মতো শিখতে চায় না ক্লাসে, বাসাতে প্রাইভেট পড়ে শিখেই আসে। আমি আসি আর যাই, এইটুকু না করলেও হাড়ে মরচে পড়ে যাবে। আমি চায়ের কাপে পরপর দুবার চুমুক দিয়ে বলি।

সমস্যা তো আসা যাওয়াতেই। দেখেন না কিভাবে বেপরোয়া নসিমন করিমনগুলো চলে, ছেলেরা বাইকও চালায় যাচ্ছেতাই। হেডমাস্টারের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে চেয়ারম্যান সাহেব।

হ্যাঁ, ঠিকই, সাইকেল চালিয়ে আর আসব না, এখন থেকে হেঁটেই আসব। বলে ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে আসি। ক্লাস ছিল, জীবনে দুমিনিটও দেরি হয়নি কোনো ক্লাসে ঢুকতে, সেদিন হয়েছিল।

সাইকেলই ভালো ছিল। সেদিন হেঁটে আসতে গিয়েই নসিমনটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শরীরের উপর চড়ে গেল। মুহূর্তে পা দুটো অবশ হয়ে গেল। এরপর আর কিছু টের পাইনি। এখন অবশ্য হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে না। মৃতের কোনো জাগতিক অসুবিধা থাকে না। মরার জীবনে এই এক সুবিধা। অসুবিধা অন্যখানে, বিরাট অসুবিধা, অংকের হিসাবের মতো জীবনের সব স্মৃতি মাথার মধ্যে গিজগিজ করতে থাকে। যত সব অপ্রয়োজনীয় স্মৃতি। যেমন এই মুহূর্তে মনে পড়ছে চল্লিশ বছর সাতাশ দিন আগের এক সন্ধ্যেবেলার কথা। আমি ফুটবলটা নিয়ে রান্নাঘরের দেয়ালে পেটাচ্ছি। মা বলল, জানিস বলেরও জীবন থাকে। বেহুদা কথা। মনে পড়তেই আমার হাসি পেল। আরও হাসি পেল এইটা ভেবে মার এই কথা বলারই কথা না। আমার জন্মের সাত মাসের মাথায় মা মারা যায়। বাবাকে ছোটো দাদির সঙ্গে রাতে দেখে ফেলেছিল। শোনা কথা তো বটেই। কিন্তু কি আশ্চয! মৃতের স্মৃতিতে মৃতরাও জীবিত। মানে আমি মারা গেলেও আমার মেয়ের তিন বছরের ছেলেটা যখন বুড়ো হয়ে মারা যাবে তখন ওর সমস্ত স্মৃতির অংশ হবো আমিও। কালেক্টিভ মেমরি। যদি তাই হয়, তাহলে একটা অংকে ভুল হলো আমার। বল নিয়ে হেঁসেলের দেয়ালে যে পেটাচ্ছিল সেটা আমার ভাই, আমার জন্মের আগের ঘটনা, মা ওকে ওই কথাটা বলেছিল। ভাইয়ের মেমোরিটাও এখন আমার মেমোরি, নাকি মায়ের মেমোরি থেকে আসল বুঝতে পারছি না। স্মৃতির হিসাবটা এখন সত্যিই গোলমেলে লাগছে। সেদিন নসিমনটা যাকে ধাক্কা দিয়েছিল সেটা আমিই তো, মানে সে বছরই তো নসিমনের ধাক্কায় করিম বুড়ো চলে গেল। বুড়োর বয়স মরার বয়স ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তবু মরে না, জোকের মতো প্রাণটা কামড়ে পড়েছিল। মরে না তো ছেলেমেয়েরাও সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা করতে পারে না। এই কারণে করিম বুড়োর মৃত্যুর সঙ্গে নিজের মৃত্যু গুলিয়ে ফেলা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। আবার এও ঠিক, একাধিক নসিমন যেখানে চলে সেখানে নসিমনের ধাক্কায় কি গ্রামে একাধিক মানুষের মৃত্যু হতে পারে না? পারে, অংকে কোনো বাধা নেই। একটু হিসাব করলেই বের হয়ে আসবে। স্মৃতিকে এখন শতশত মৃত্যুর ডেটাবেজ। সমস্যা হলো কোনোটাই ইমপারসনাল না। যে কোনো মৃত্যুই নিজের মৃত্যু বলে মনে হচ্ছে। মরা মানুষের মৃত্যু বোধহয় এমনই। যে মারা গেছে তার মৃত্যু ভাবনা খুবই হাস্যকর। তার চেয়ে হাস্যকর জীবন নিয়ে ভাবনা। এক্ষেত্রে উপহাস্য শব্দটা আরো উপযুক্ত। দুটোর কোনোটাই আমার কবর থেকে বের হয়ে আসার উপলক্ষ্য না।

আমার মৃত্যুতে কারো কি এতটুকু ক্ষতি হয়েছে? কবর থেকে অনেকটা পথ হেঁটে গ্রামে ঢুকতে হয়। নসিমন করিমের দৌরাত্ম বেড়েই চলেছে। এখন অবশ্য হাঁটতে আর অসুবিধা হচ্ছে না। ‍অনভ্যস্ততার কারণে রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলতে অসুবিধা হলেও আমি জানি, ট্রাকের সামনে দিয়েও হেঁটে যেতে পারব। পারব মানে থিওরিটিক্যালি কোনো সমস্যা না। মানুষ এমনও বলে, লোকটার কই মাছের প্রাণ, বার বার বেঁচে উঠছে—মরতে মরতে বেঁচে যাচ্ছে। কিন্তু কখনোই বলে না, লোকটা বার বার মরে যাচ্ছে—বাঁচতে বাঁচতে মরে যাচ্ছে! মানে বেঁচে থাকার অসম্পূর্ণতা থাকলেও মৃত্যুর নেই, কেউ যখন মরে সম্পূর্ণই মরে।

বটগাছটার নিচে এসে বসি। অনেক প্রাচীন বটগাছ। এমনও শুনেছি, গ্রামের পত্তন ঘটেছিল এই বটগাছ দিয়ে। আরব দেশ থেকে এক দরবেশ এসে পথ হারিয়ে এখানে ধ্যান করতে বসে, ধ্যান করতে করতে তার শিকড় গজিয়ে যায়, ডালপালা তৈরি হয়। যতদিনে ধ্যান ভাঙে, ততদিনে পূর্ণ বৃক্ষ। মানুষের ছায়া ধরে ধরে নাকি গ্রামে হেঁটে বেড়াত। দেখা গেল মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে সোজা কিন্তু ছায়াটা বটগাছের মতো ঝাঁকড়া, আলুথালু। শেষ পর্যন্ত সড়ক বড়ো করার জন্য গাছটাতে কেটে ফেলা হলো। গ্রামের লোকজন সাহস করেনি। শহর থেকে মেশিন আনিয়ে কাটা হয়েছে। প্রশস্ত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভুলেই গিয়েছিলাম গাছটির কথা। বয়স্ক গাছের মৃত্যু প্রবীণ মানুষের মৃত্যুর মতোই—মানুষ স্মৃতিময় অতীত ঘাটে কিন্তু আফসোস করে না। গ্রামে ঢুকেই চোখে পড়ল বটগাছটা। সময় মৃত এবং জীবিত, দুজনের দুই রকম, কবর থেকে না উঠে আসলে জানা হত না। মানুষ জীবন জ্বালিয়ে স্মৃতি তৈরি করে, মৃতরা সেই স্মৃতি যাপন করে। যে আমি সব সময় স্মৃতিহীন মনে করেছি নিজেকে, একটা শূন্য জীবনের ভার বয়ে গেছি বছরের পর বছর, সেই আমারও এত স্মৃতি এখানে!

বটগাছের নিচে বসে থাকতে থাকতে নিজের বাড়ির কথা মনে হয়। ছেলেটা শহরে থাকে। একমাত্র ছেলে আমাদের। তাও বোনটা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেল বলে নিঃসন্তান হয়েও আমরা একটা সন্তানের বাবা-মা হয়েছিলাম। ছেলেটা বড়ো হলো, শিক্ষিত হলো, রাজধানীতে চাকরি পেল, সুতোটা কিভাবে কেটে গেল আমরা কেউই টের পেলাম না। পড়াশুনা শেষ করানোর পর যতটুকু যা ছিল চাকরির সময় সেটুকুও বিক্রি করতে হলো। ফিরতে হবে সংসারে এমন আর কিছুই ছিল না ওর জন্য। স্ত্রী এখনো বেঁচে, এখন একার সংসার তার। আমার মৃত্যুতে তার কিছু ক্ষতি হতে পারত, কিন্তু হবে না। মাথাটা বিগড়ে যাওয়ার পর থেকে ভালো মন্দ, লাভ ক্ষতি কোনো কিছু সম্পর্কে ওর কোনো বোধ নেই। যে আমাকে চিনত না, সেই আমার থাকা না-থাকা ওর জন্য কোনো ঘটনা না। এই কারণে হয়তো মৃত্যুর সময় আর কোনো টান ছিল না আমার। স্বার্থপরের মতো নিরুদ্বেগে নিশ্চিন্তে মরে যেতে পেরেছি। একবারও মনে হয়নি শিশুর মতো নির্বোধ মানুষটাকে দেখবে কে! এখন আর এসব ভেবে খারাপ লাগছে না। মৃত্যুর পর সব চিন্তাই একরকম, খারাপ ভালো কিছুই লাগে না।

বাড়িতে ঢুকে দেখি উঠোনে মা বসা। আমার মা, জন্মের পরপরই হারিয়েছিলাম যাকে। চেনা অচেনা অনেক মানুষই আছে চারপাশে। কে জীবিত কে মৃত বোঝা যায় না আর। অনেক মানুষের জটলার কেন্দ্রে একটা খাটুলি, মধ্যে সাদা কাফনে মোড়া এক মৃতদেহ। মুখের উপরের কাপড়ের অংশটা তুলে মাঝে মধ্যে কেউ কেউ দেখে আসছে। কারো চোখে-মুখে কোনো কান্নার রেশ নেই। কান্না-পরবর্তী ক্লান্তির ছাপটুকু অবশ্য বোঝা যাচ্ছে। অনেক আগেই হয়তো মারা গেছে। দাফনে দেরি হচ্ছে কোনো কারণে। বাড়িতে মারা যাওয়ার মতো আমার স্ত্রীই কেবল বেঁচে। ঘটনাটি এখনই ঘটছে নাকি কোনো এক সময়ে ঘটে যাওয়া, বুঝতে অসুবিধাই হচ্ছিল। মৃতদেহের মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। কেউ মুখের কাপড়টা তুললে দেখব। অনেকক্ষণ কেউ আসে না। জীবিত মানুষের চেয়ে মৃতের কদর খুব অল্প সময়ে পড়ে যায়। একটা দিনও হয়তো হলো না, এরইমধ্যে গুরুত্বহীন হয়ে গেল মানুষটা! এতক্ষণে আমার স্ত্রীকে দেখতে পাই। ভেঙে পড়া প্রাচীরের স্তূপ হয়ে থাকা ইটের ওপর বসা। কে তবে এভাবে মরে পড়ে আছে? কার জন্য এই অপেক্ষা? কেউ একজন খাটুলির কাছে আসে। আসতে দেরি হলো বলে নিজের কাছে কৈফিয়তের মতো সারাদিন কি কি করতে হয়েছে সেসব কাজের বিবরণ দিতে থাকে। ডান হাতের দুটি আঙুল দিয়ে সাবধানে মুখের কাপড়টা সরায়। বিস্ময়ে আমার হতবাক হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু না, কাফনের মধ্যে নিজেরই শরীর পড়ে আছে দেখেও আমার মধ্যে এতটুকু বিস্ময় জাগে না। কবর থেকেই যখন উঠে এলাম তখন আর ফেরার তাড়া কিসে!    

Leave a Comment Cancel reply

© All Rights Reserved By: Mojaffor Designed & Developed By Webcode Technology