হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনীচর্চায় ব্রাহ্ম/হিন্দুসমাজের ভূমিকা
Published On October 24, 2024কিছু কিছু বই ভালো-মন্দ প্রশ্নকে ছাড়িয়ে নিজেই ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। প্রকাশ হয় আজ থেকে ১২০ বছর আগে প্রকাশিত রামপ্রাণ গুপ্তের ‘হজরত মোহাম্মদ’ তেমনই একটি বই। কোন ইতিহাসের অংশ?
উনিশ শতকে বাংলা গদ্যের শুরুতে হজরত মুহাম্মদকে নিয়ে বই লেখা শুরু। ফোর্ট উউলিয়াম কলেজের মিশনারিরা হযরত-জীবনী প্রকাশ করেছিলেন খ্রিস্টান ধর্মের প্রচারপত্র হিসেবে। কিভাবে? সে সব বইয়ের উদ্দেশ্য ছিল নবীর চরিত্রনাশ করে ইসলামের চেয়ে যেয়ে খ্রিস্টধর্ম মহাস সেটা প্রমাণ করা, বাংলায় ইসলাম ও হিন্দুবিদ্বেষ ছড়ানো। তেমই একটি বই ‘মহম্মদের জীবনচরিত্র’। প্রকাশিত হয় ১৮৫৮ সালে। লেখক অজ্ঞাতনামা হলেও রেভারেন্ড জেমস লঙের গ্রন্থতালিকায় বইটির উল্লেখ পাওয়া যায়। এই বইতে মুহাম্মদের জীবনকে কুৎসামূলক হিসেবে প্রচার করা হয়। এরকম আরেকটি বই লেখেন পাদ্রি জি এইচ রাউস, ১৮৮৪ সালে।
এই ধরনের বইগুলোর প্রতিক্রিয়া তখন মুসলিম সমাজ থেকে উঠে আসেনি। কারণ তখন জবাব দেওয়ার মতো পণ্ডিত মুসলিম সমাজে খুব বেশি ছিলেন না। কারণ অনেক, তবে মোটা দাগে এটা বলা যায়, ইসলামের ইতিহাস নিয়ে বাংলা ভাষায় তখন বইপত্র ছিল না। পুথিসাহিত্য ছিল কিন্তু সেটা তো একাডেমিক চর্চার বিষয় না। কোনো কোনো মুসলমান তখন এটাও মনে করতেন যে, ‘মুহাম্মদ বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন’ [বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক, পৃ ৬০]।
বাংলা গদ্যে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম বই লেখেন শেখ আবদুর রহিম, ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত হয়। তিনি সে বইতে প্রথম ইউরোপীয়দের মিথ্যা প্রচারণামূলক নবীজীবনীর প্রতিবাদ করেন। এ সময় কয়েকজন হিন্দু লেখক, বিশেষ করে ব্রাহ্মসমাজের লেখকরা হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাব তৈরি ও ইসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। ‘ইসলামের একেশ্বরবাদ-তত্ত্ব ব্রাহ্মরা ব্রহ্ম-স্বরূপ-সন্ধানে গ্রহণ করে।’ [পৃ.২৪] রাজনারায়ণ বসু তো ইসলামধর্ম গ্রহণ করবেন বলে হ্যান্ডবিল বিলি করেছিলেন। ব্রাহ্মসমাজের পণ্ডিতরা ধর্মতত্ত্বচর্চার অংশ হিসেবেও ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এ জন্য তারা আরবি ফারসি ভাষা শেখেন। এঁদের মধ্যে ভাই গিরিশচন্দ্র সেন, কৃষ্ণকুমার মিত্র, অতুলকৃষ্ণ মিত্র এবং তাঁদের পথ ধরে আলোচ্য গ্রন্থের লেখক রমাপ্রাণ গুপ্ত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তক রামমোহন নিজেও হযরত মহম্মদের জীবনী লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর প্রথমদিকের রচনাগুলো ছিলো আরবি ও ফার্সি ভাষায় রচিত। মুসলামদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মুসশী মায়জুদ্দীন ও আবদুর রহিম। এ সময় ‘মুসলমান পত্রিকা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন শশিভূষণ মুখোপাধ্যায়। সম্পাদক ছিলেন রেয়াজুদ্দীন আহমদ। শশিভূষণ প্রকাশ করতে এগিয়ে না আসলে রেয়াজুদ্দীনের পক্ষে এটা করা সম্ভব হতো না। রামপ্রাণ গুপ্তের ‘হজরত মোহাম্মদ’ গ্রন্থটিও ধারাবাহিক প্রকাশ করে কেদারনাথ মজুমদারের ‘আরতি’ পত্রিকা। তখন বাংলা প্রেসিডেন্সি ও আসাম প্রদেশের ডিরেক্টর বাহাদুর কর্তৃক বিদ্যালয়ে হিন্দু-মুসলিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা হয়। বলা বাহুল্য, হিন্দু শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই তখন বেশি ছিল। রামপ্রাণ গুপ্ত হযরত-জীবনী রচনার উদ্দেশ্য হিসেবে লিখেছিলেন, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি এবং মুহাম্মদকে সকলের জন্য অনুকরণীয় করে তোলা। তিনি উৎসর্গপত্রে লেখেন: ‘বঙ্গীয় মোসলেম ভ্রাতৃবৃন্দকে এই গ্রন্থ সদ্ভাবের নিদর্শন স্বরূপ উপহার প্রদান করিলাম।’
প্রসঙ্গক্রমে অবশ্যই স্মরণ করতে হয় ভাই গিরিশচন্দ্র সেনকে। তিনি বাংলা ভাষায় প্রথম পুর্ণাঙ্গ কোরান অনুবাদ করেন। প্রকাশিত হয় ১৮৮১ সালে। এই অনুবাদের জন্য তিনি মৌলভির কাছে আরবি-ফারসি শেখেন। তিনি কোরান অনুবাদের পাশাপাশি হযরত মুহাম্মদের জীবনীও লেখেন। ‘মহাপুরুষ মোহাম্মদের জীবনচরিত’ নামে বইটি ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত হয়। ইসলামী বুজুর্গদের জীবনী নিয়ে লেখা তাপসমালা আমাদের অনেকের পড়া, বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে। প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮০ সালে। তিনি হাদিস ও ইসলামি মনীষা নিয়ে আরো কিছু বই লিখেছেন। তার সম্পর্কে আমার পূর্নাঙ্গ একটি লেখা আছে, আলাদা করে পরে কখনো পোস্ট করবো। কৃষ্ণকুমার মিত্র ১৮৮৬ সালে লেখেন ‘মহম্মদরচিত্র ও মুসলমান ধর্মের সংক্ষিপ্ত বিবরণ’। সেই সময়ে, ১৮৯২ সালে, অতুলকৃষ্ণ মিত্র ‘ধম্মবীর মহম্মদ’ নামে নাটক লিখে মঞ্চে আনতে চেয়েছিলেন। অবশ্য মুসলমান সমাজের আপত্তির কারণে তিনি সেটা করেননি। তাঁর উদ্দেশ্য কিন্তু মহতই ছিল। সেই নাটক এখনো পাওয়া যায় কলকাতায়। আরো কিছুটা পরে ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় শ্রীকেদারনাথ মিত্রের ‘মুসলমান ভক্তচরিত’। ততদিনে অবশ্য মুসলমান লেখকদের মাধ্যমে নবী ও ইসলাম প্রসঙ্গে অনেক বই প্রকাশিত হয়ে গেছে। উল্লেখ করতে হয়, ১৮৬৩ সালে আবদুল লতিফের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘মহামেডান লিটারারি সোসাইটি’র কথা। মুসলমানরাও তখন হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত ‘হিন্দু-মুসলমান সম্মিলনী’ পত্রিকার সম্পাদক যেমন ছিলেন গোলাম কাদের। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত কোহিনূর পত্রিকা হিন্দু-মুসলিমের সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেয়। ‘নবনূর’ পত্রিকা ‘হিন্দু-মুসলমানের বিরোধের কারণ ও তৎপ্রতিকারের উপায়’ বিষয়ে এক রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এই পত্রিকাগুলোতে তখন রামপ্রাণ গুপ্ত, মীর মশাররফ হোসেন, রোকেয়ার মতো দুই দিকের প্রাজ্ঞসর লেখকরা লিখতেন। পত্রিকায় মহাম্মদকে বিহারীলাল দেবনাথের একটি গান প্রকাশিত হয়। শুরুটা এরকম: ‘ধন্য ধন্য হে মোহাম্মদ পৃথিবীতে জন্মেছিলে/ তুমি একমেবাদ্বিতীয়ম নামে সবাকারে উদ্ধারিলে।/ পৌত্তলিকতার মূল উৎপাটন করিতে হইলো তোমার জনম/ তব বিশ্বাস বলেতে পৃথিবী হইতে জড়ো পূজা গেল চলে।’ [৩২ পৃ.]
উল্লেখ করা প্রয়োজন, রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী একেশ্বরবাদী ছিলেন। তিনিও হযরত মুহাম্মদকে প্রবন্ধে, ভাষণে, কবিতায়, গানে স্মরণ করেছেন মহামানব হিসেবে। তিনি বলেন, ‘মানুষের ধর্মবুদ্ধি খণ্ড খণ্ড হইয়া বাহিরে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল, তাকে মহাম্মদ অন্তরের দিকে, অখণ্ডের দিকে লইয়া গিয়াছেন, সহজে পারেন নাই; এর জন্য সমস্ত জীবন তাকে মৃত্যু সংকুল দুর্গম পথ মাড়াইয়া চলিতে হইয়াছে।’
আব্দুল করিমের ‘ভারতবর্ষে মুসলমান রাজত্বের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থের আলোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘এদিকে অনতিপূর্বে ভারতবর্ষের প্রতিবেশে বহুতর খণ্ড-বিখণ্ড জাতি মহাপুরুষ মহম্মদের প্রচণ্ড আকর্ষণবলে একীভূত হইয়া মুসলমান নামক এক বিরাট কলেবর ধারণ করিয়া উত্থিত হইয়াছিল।…’
‘প্রাচ্য সমাজ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লেখেন:
‘…এমন সময়ে মহম্মদের আবির্ভাব 0হইল। মর্ত্যলোকে স্বর্গরাজ্যের আসন্ন আগমন প্রচার করিয়া লোকসমাজে একটা হুলস্থুল বাধাইয়া দেওয়া তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল না। সে-সময়ে আরব-সমাজে যে-উচ্ছৃঙ্খলা ছিল তাহাই যথাসম্ভব সংযত করিতে তিনি মনোনিবেশ করিলেন।’
‘ধর্মের অধিকার’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,
‘মহম্মদের আবির্ভাবকালে পৌত্তলিক আরবীয়রা যে তাহার একেশ্বরবাদ সহজে গ্রহণ করিয়াছিল তাহা নহে, তাই বলিয়া তিনি তাহাদিগকে ডাকিয়া বলেন নাই তোমাদের পক্ষে যাহা সহজ তাহাই তোমাদের ধর্ম, তোমরা বাপ-দাদা ধরিয়া যাহা মানিয়া আসিয়াছ তাহাই তোমাদের সত্য। তিনি এমন অদ্ভুত অসত্য বলেন নাই যে, যাহা দশজনে মিলিয়া বিশ্বাস করা যায় তাহাই সত্য, যাহা দশজনে মিলিয়া পালন করা যায় তাহাই ধর্ম। একথা বলিলে উপস্থিত আপদ মিটিত কিন্তু চিরকালের বিপদ বাড়িয়া চলিত।’
রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর পরিবার ছিলেন অসাম্প্রদায়িক সমন্বয়বাদী চেতনার অধিকারী। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের লেখা হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী গাওয়া হতো গৌতম বুদ্ধের জন্মদিনে। যিশুর জন্মদিনে, ‘একদিন যারা মেরেছিল তাঁরে গিয়ে’, গুরু নানকের জন্মদিনে ‘গগনের ফলে রবীচন্দ্র দীপক জ্বলে’ এবং হযরত মুহম্মদের জন্মদিনে মন্দিরের অনুষ্ঠানে ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো’’ গানটি গাওয়ার রেওয়াজ ছিল।
মৃত্যুর বছর পাঁচ আগে দিল্লী জামে মসজিদ থেকে প্রকাশিত The Peshwa পত্রিকার ‘পয়গম্বর’ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের বাণী প্রকাশিত হয়। তিনি লেখেন:
‘I take this opportunity to offer my veneration to the Holy Prophet Mohammad. One of the greatest personalities born in the world. Who has brought a new and latent force of life into human history, A vigorous ideal of purity in religion….’
একটা বই নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এত কথা বললাম কেন বুঝতে পেরেছেন তো? ওই যে, একটা বই ইতিহাসের অংশ…! কোন ইতিহাসের অংশ বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয়? সেই সময়, যখন কলকাতা ও বৃহত বঙ্গে খ্রিস্টান মিশনারিজ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিকৃত করা হচ্ছে ইসলামের নবীকে এবং সেই হীন উদ্দেশ্যের প্রতিবাদ করে মুহাম্মদ ও ইসলাম নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে গদ্যভাষায় গ্রন্থ লেখা পণ্ডিতের অভাব, তখন এই পণ্ডিতরা এগিয়ে এসেছেন ইসলাম ও মুসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে। কোন সমাজে? প্রধানত হিন্দু সমাজে, কারণ তারা প্রধানত সেই সমাজেরই প্রতিনিধিত্ব করতেন। রামপ্রাণ গুপ্ত হিন্দুসমাজে দৃঢ়কণ্ঠে লিখছেন: ‘বস্তুতঃ মোহাম্মদ বাহুবলের সাহায্যে ধর্মপ্রচার করেন নাই। হযরত মোহাম্মদ সংস্কারক। এ ঈশ্বরের বার্তাবাহক।’
এখন তো ইসলামধর্ম নিয়ে লেখার জন্য মুসলমান লেখক-পণ্ডিতের অভাব নেই। অথচ এখন কতক ‘শিক্ষিক’ বাঙালি মুসলমান কি করছেন? উল্লিখিত ইতিহাস বিকৃত করার হীনচেষ্টায় প্রচার করছেন ভাই গিরিশচন্দ্র সেন কুরানের প্রথম অনুবাদক নন। এমনকি এও বলছেন, তিনি কুরানের অনুবাদই করেননি!! লাখে লাখে বাংলাদেশি মুসল্লি ফেসবুকে এই মিথ্যাচার ও বিদ্বেষ শেয়ার করে আসছেন গত এক দশক ধরে। আমি এমনও লোক দেখেছি, সত্যটা জেনেও সেই প্লান্টেড অপপ্রচারে অংশ নিচ্ছেন। উনবিংশ শতকের সেই মিথ্যাচারী কূটপরিকল্পনাকারী সাম্প্রদায়িক খ্রিস্টার্ন পাদরিদের চেয়েও এরা নিকৃষ্ট। কারণ এরা সত্যকে শুধু বিকৃতই করছেন না, যারা ভ্রাতৃত্বের মায়া নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁদের অপমান করছেন; অস্বীকার করলেও ঠিক ছিল, উল্টো অপবাদ দিচ্ছেন। আপনাদের ইসলাম কি আপানাদের এই শিক্ষা দেয়? কথাগুলো বলার জন্য আমাকে গালি না দিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন।
হাসির মল্লিকের অসাধারণ ভূমিকা ও সম্পাদনায় ১৯০৪ সালে প্রকাশিত আলোচ্য বইটির বটতলা সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালে।


Leave a Comment