Mojaffor Hossain

Mojaffor Hossain

Mojaffor Hossain

Fiction Writer & Literary Critic
  • Home
  • About
    • Biography
    • About Me
  • Writings
  • Book Lists
  • Awards List
  • Books
  • Interviews
  • Donate
  • Reader-Opinion
  • Gallery
  • Contact me
Writings Details

অনুবাদক কি সৃজনশীল সাহিত্যিক?

Published On August 2, 2022
Mojaffor Hossain
Mojaffor Hossain
Contributor

অনুবাদ সাহিত্য সাহিত্যের চূড়ান্ত মর্যাদা পেতে পারে কিনা এ নিয়ে একটা মৃদু তর্ক বা সংশয় এখনো অনেকের মনে রয়েই গেছে। এ তর্ক যারা করেন তাঁরা উদ্ধৃত হিসেবে ব্যবহার করেন রবার্ট ফ্রস্টের সেই কথাটি—অনুবাদে যা হারায়, তাই কবিতা। অনেকটা একই কথা রবীন্দ্রনাথও বলেছেন। অমিয় চক্রবতীর্কে লিখিত এক পত্রে তিনি বলেন, ‘বাছুর মরে গেলে তার অভাবে গাভী যখন দুধ দিতে চায় না, তখন মরা বাছুরের চামড়াটা ছাড়িয়ে নিয়ে তার মধ্যে খড়ভত্তির্ করে একটা কৃত্রিম মূত্তির্ তৈরি করা হয়, তার গন্ধে এবং চেহারার সাদৃশ্যে গাভীর স্তনে দুগ্ধক্ষরণ হতে থাকে। তজ্জর্মা সেইরকম মরা বাছুরের মূর্ত্তি—তার আহ্বান নেই, ছলনা আছে। এ নিয়ে আমার মনে লজ্জা ও অনুতাপ জন্মায়। সাহিত্যে আমি যা কাজ করেছি তা যদি ক্ষণিক ও প্রাদেশিক না হয়, তবে যার গরজ সে যখন হোক আমার ভাষাতেই তার পরিচয় লাভ করবে।’ অনুবাদের বিপরীতে ইতালির প্রচলিত একটা প্রবাদ আমরা স্মরণ করতে পারি : Traduttore, traditore অর্থাৎ Translator, traitor যার যুতসই বাংলা করেছেন অনুবাদক-ভাষাবিদ হায়াৎ মামুদ ‘তর্জমা-জোচ্চুরি’। এর কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন : ‘পণ্ডিতজন প্রশ্ন করতে পারেন : ভাই, এটা কী হল? বলা হচ্ছে Translator-traitor, আর তুমি করলে translation-treason? ঠিকই, অভিযোগে যুক্তি আছে। আত্মপক্ষ সমর্থন করে তখন বলব, আমি মাছিমারা কেরানি হইনি, আমি আমার সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়েছি।’ বলব, ‘যে-কেউই তো লিখবেন ‘অনুবাদক-প্রতারক’, কিন্তু আমি লিখি ‘তর্জমা-জোচ্চুরি’, কেননা আমি ঐ খেলাটা হাতে-কলতে খেলতে চাই।’ [অনুবাদে সৃজনশীলতার সীমানা, হায়াৎ মামুদ]

এই উন্নাসিকতার বিপরীতেও অনুবাদ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। বেনজামিন তাঁর ‘দ্য টাস্ক অব দ্য ট্রান্সলেটর’ প্রবন্ধে বলছেন, অনুবাদের কাজ হলো মূলের ঘাটতি কাটিয়ে উঠে একটা আদর্শ টেক্সটের কাছাকাছি পেঁৗছে যাওয়া। অর্থাৎ অনুবাদ মূলের চেয়েও খাঁটি। কথাটা বোর্হেস একটু ঘুরিয়ে বলছেন। তাঁর মতে, ‘অনুবাদের জন্ম মূলের পরে হওয়ায় অনুবাদ মূলের চেয়ে বেশি আধুনিক এবং যে কারণে বেশি সভ্য। তিনি আরো বলছেন, আমরা যখন কোনো ভালো অনুবাদ পড়ি, তখন কতই না ভালো হতো যদি আমরা না জানতাম যে কোনটা মূল আর কোনটা অনুবাদ। তখন দেখা যেত অনেক সময়েই আমাদের যেটা বেশি ভালো লাগছে সেটা মূল নয়, বরং মূলের ভাষান্তর। কোনটা বেশি ভালো কাজ, সে বিচারটা তখন অনেক নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে করা যেত।’ [মাসরুর আরেফিন/বোর্হেস ও আক্ষরিক অনুবাদের সৌন্দর্য]। মার্কেসও প্রায় একই কথা বলেছেন তাঁর ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদক গ্রেগরি রাবাসা সম্পর্কে প্রশংসা করতে গিয়ে। তিনি বলেন : ‘অনূদিত কর্ম মূলের চেয়ে ভালো কী খারাপ তা আমাকে ততটা আগ্রহী করে না যতটা করে এই সত্য যে অনুবাদকর্মে রত হওয়ার অর্থই হল সৃজনশীলতার ধারণার মোকাবিলা করা। সব লেখাই পূর্ববতীর্ লেখাকে মুছে নতুনভাবে জন্ম নেয়—এমন উত্তরাধুনিক মতামতকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মানতে হয় এবং অনুবাদশিল্প হল সেই সম্ভাবনারই একেবারে আক্ষরিক প্রতিরূপ। [খালিকুজ্জামান ইলিয়াস/অনুবাদের সৃজনশীলতা]।

একবিংশ শতকে এসে ‘অনুবাদ সাহিত্য কিনা’ এই তর্কের অবসান মোটামুটি ধটে গেছে। কেননা এখন এটা প্রমাণিত যে, অনুবাদ অবধারিতভাবে সাহিত্য। এবং কখনো কখনো মৌলিক সাহিত্য। অনুবাদ সাহিত্য ক্লাসিকের মর্যাদাও পেয়েছে। যেমন রাজা জেমসের অনুবাদে বাইবেল কিংবা পোপের অনুবাদে হোমার ইংরেজি সাহিত্যে এখন ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃত। শেকসপিয়ার বলতে গেলে সবচেয়ে চতুর ও সার্থক অনুবাদক। তাঁর লেখা প্রায় সব নাটকের কাহিনি তিনি বিভিন্ন সোর্স থেকে নিয়েছেন। এটিও এক প্রকার অনুবাদ। অনুবাদ মূলকে অনুসরণ করে বলে আমরা একে মৌলিক সাহিত্য বলে ভাবি না। মূলকে অনুসরণ করা অনুবাদ সাহিত্যের কোনো ত্রুটিপূর্ণ দিক নয়। মৌলিক সাহিত্যেরও কিন্তু এক বা একাধিক মূল থাকে, যেগুলোকে প্রত্যক্ষ বা প্রচ্ছন্নভাবে অনুসরণ করা হয়। কবি ওক্তাবিও পাস যে কারণে বলছেন : ‘প্রতিটি রচনাই অনন্য অথচ প্রতিটি আসলে অপর একটি রচনার অনুবাদ। মানতেই হবে কোনো রচনাই মৌলিক নয়, কারণ সব ভাষার নির্যাস তো আসলে অনুবাদক্রিয়া—প্রাথমিকভাবে অবাচনিক বিশ্ব থেকে বাচনিক বিশ্বে এবং অতঃপর প্রতিটি প্রতীক চিহ্ন এবং প্রতিটি শব্দ অপর প্রতীক চিহ্ন ও শব্দেরই অনূদিত রূপমাত্র।’ [অনুবাদ : সাহিত্য ও আক্ষরিকতা—অক্তাবিও পাস, অনুবাদ: আবদুস সেলিম, দৈনিক যুগান্তর সাহিত্য সাময়িকী] প্লেটো আরো ব্যাপক অর্থে বলছেন, বিশ্বের সবকিছুই ধারণার ছায়া কিংবা কোনো মূল ধারণার অনুকরণ।

অনুবাদের ক্ষেত্রে মনে করা হয়, অনুবাদক নিজে সৃজনশীল লেখক হলে অনুবাদ ভালো হয়। মূলের প্রতি ভালোবাসা থেকে ভালো অনুবাদ সম্ভব। কথাটা আপাতভাবে সত্যি বটে। তবে অনেক উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাবে এটাই চূড়ান্ত কথা নয়। যেমন মার্কেজের One Hundred Years of Solitude অনুবাদ করেছেন গ্রেগরি রাবাসা। মার্কেস এই অনুবাদ পড়ে বলেছিলেন, তাঁর অরিজিনালের চেয়ে ভালো হয়েছে। কেমন করে সেটি সম্ভব হলো সে প্রসঙ্গে রাবাসা জানাচ্ছেন : ‘কোথায় যেন গাবো লিখেছিলেন যে, তাঁর মতে আমার অনুবাদের পদ্ধতি হলো—আমি প্রথমে তাঁর বইটি মন দিয়ে পড়েছি এবং তারপরে ইংরেজি ভাষায় তাকে নতুন করে লিখেছি। এটা হতে পারত এক মহান কীর্তি এবং সাহিত্যের ইতিহাসে এমন অনেকবারই হয়েছে যে, এক মহান সাহিত্যের অথবা পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে রচিত হয়েছে সম্পূর্ণ অভিনব নতুন সাহিত্যকর্ম। আমার তরুণী নাতনি জেনিফার সম্প্রতি হানসেল আর গ্রেটেলের রূপকথা অবলম্বনে গ্রিক পুরাণের শৈলীতে রচনা করেছে নতুন কাহিনি, যাতে বজ্জাত ডাইনি ফিরে এসেছে সৎপথে। এটা কেমন করে সম্ভব হলো যে আমি অনুবাদ করলাম শব্দের পর শব্দ, আর বাক্যের পর বাক্য, কিন্তু গাবো ভাবলেন ঠিক তার উলটো। অবশ্য আমি যেটা সচরাচর করি না—অনুবাদের আগে পুরো বইটা আগাগোড়া পড়েছি, সুতরাং তাঁর কথায় খানিকটা হলেও সত্যি রয়েছে।’ [মার্কেস অনুবাদের অভিজ্ঞতা/গ্রেগরি রাবাসা/অনুবাদ অংকুর সাহা] কর্মজীবনে রাবাসা লিপিকার ছিলেন। তিনি নিজে কখনো উপন্যাস লেখেননি। পরে অবশ্য প্রচুর অনুবাদ করেছেন। এরকম প্রফেশনাল অনুবাদকদের দ্বারাই বরং বিশ্বের অনুবাদ সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে। পেশা হিসেবে যাঁরা অনুবাদকে বেছে নেন তাঁরা সবসময় মূলের প্রতি ভালোবাসা থেকে অনুবাদ করতে পারেন না। কিন্তু সেই কারণে সবসময় যে অনুবাদ খারাপ হয়, তাও নয়। অন্যদিকে মূলের প্রতি ভালোবাসা থেকে প্রচুর বাজে অনুবাদও আমরা পেয়েছি। আরো একটা কথা আমরা বলে থাকি, মূল ভাষা থেকে অনূদিত হলে অনুবাদের মান ভালো হবে। কথাটা যৌক্তিক শোনালেও বাস্তবিকপক্ষে সবসময় সত্য হয়ে ফলেনি।

অনুবাদ সাহিত্য সাহিত্যের চূড়ান্ত মর্যাদা পেতে পারে কিনা এ নিয়ে একটা মৃদু তর্ক বা সংশয় এখনো অনেকের মনে রয়েই গেছে।

Leave a Comment Cancel reply

© All Rights Reserved By: Mojaffor Designed & Developed By Webcode Technology