অণুগল্প: শূন্য
Published On August 4, 2022ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকি, দিনের পর দিন। সামনে কোনো অপেক্ষা নেই, ফুরিয়েছে ফিরে যাওয়ার তাড়া। মাঝে মধ্যে মনে হয়, উঠোনটা মুঠোয় নিয়ে যদি পালাতে পারতাম বাড়ি থেকে! কিন্তু পালাব কোথায়?
মা কাঁদছে, মরিয়ম এসে বলে। মরিয়ম আমার খালার মেয়ে। খালা খালুর হাতে খুন হলে মা-ই ওকে এখানে নিয়ে এসেছে। ছোট্ট মরিয়র মার খবরটা দিয়ে চলে যায়।
মার জন্য ফিরব না; যাবো অন্য কোনো কারণ তৈরি হলে। ভাবতে ভাবতে উঠে ফের বসি। বসে থাকতে আর ভালো লাগে না। কিন্তু শরীরটা তুলে নিয়ে হাঁটার ব্যাপারে ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাই না। মন আর শরীর আলাদা করে বসি। মন খুলে দিয়ে দেখি সে চলতে পারে কিনা, পারে কিন্তু যায় না। শরীরটাতে ঠেস দিয়ে বসে। মন আর শরীরটার মাঝে আরেকটা আমি তৈরি হয় এদুটোকে একসঙ্গে দেখার জন্য। এই প্রথম বুঝতে পারি কোনো কিছু না ভেবেও থাকা যায়। চিন্তাকে একদম শূন্যের অঙ্কে থামিয়ে রাখা যায়। ভাবনা না থাকলে সময় অর্থহীন, নিশ্চল। কতক্ষণ পর মনে হয় অনন্তকাল ধরে বসে আছি। আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই।
মা আর নেই, মরিয়ম ফিরে এসে জানায়। আমার কিছু মনে হয় না ওর কথা শুনে। মা বহুদিন থেকে আত্মহত্যা করব করব বলে বাবাকে ভয় দেখিয়ে আসছে, কিন্তু বাবা ভয় পায়নি কখনোই। আমাদেরও কিছু মনে হয়নি। ভাষা থেকেও উঠোনের পেয়ারা গাছটির সঙ্গে মায়ের কোনো পার্থক্য সংসারে ছিল না। সত্যি সত্যি আত্মহত্যা করে থাকলে একটা পার্থক্য প্রমাণিত হবে। এই প্রমাণে কারো কিছু এসে যায় না যদিও, তবু মরে থাকলে মা বেঁচে গেল। মরিয়ম চলে যায়। ছাগল ছানার মতো ওর লাফিয়ে লাফিয়ে চলে যাওয়া দেখতে দেখতে আমি মার কথা ভুলে যাই। আমার আর কারো জন্য খারাপ লাগে না। মরিয়মের লাশটা যেদিন বিচালির পালার নিচে পাওয়া গেল, শরীরের কোথাও কোনো কাটাছেঁড়ার দাগ ছিল না। লাল হাফ প্যান্টটা দেখে কেবল মা চিৎকার দিয়ে বলেছিল, সাদা প্যান্টটা লাল হলো কেমন করে? বাবা সারারাত নেশা করে পড়েছিল স্তূপের ওপাশেই। সেদিনও আমার খারাপ লেগেছিল কিনা এখন আর মনে পড়ে না। যখন ভালো খারাপ কিছুই আর লাগে না তখন এভাবে অনন্তকাল বসে থাকা যায়। মা আমার পাশে এসে বসে। আমার দেখাদেখি শরীর আর মনটা এপাশ ওপাশ করে। আজ থেকে মারও কোনো কিছুতেই ভালো খারাপ কিছুই লাগবে না।

Leave a Comment